
꧁✸ শ্রীনিবাস আচার্য প্রভুর জীবনী ✸꧂
নদীয়া জেলায় অগ্রদ্বীপের উত্তরে চাখন্দি গ্রামে শ্রীনিবাস আচার্য প্রভু আবির্ভূত হন। তাঁহার পিতার নাম শ্রীগঙ্গাধর ভট্টাচার্য ও মাতার নাম লক্ষীপ্রিয়া। শ্রীনিবাস মাতৃগর্ভে থেকেই সমস্ত গ্রামে নামের বন্যায় ভাসিয়ে ছিলেন। সেসময় জমিদার দুর্গাদাস ঢেড়া দিয়ে আদেশ জারী করার নির্দেশ দিলেন, দেবীদুর্গার নাম ছাড়া যেন আর কেউ অন্য নাম না নেয়। এরপর ঢুলিয়ারা ঢোলে বাড়ি দিতেই ‘রাধাকৃষ্ণ’ নাম উচ্চারিত হতে লাগলো, সব লোক রাধাকৃষ্ণের নামে উন্মত্ত হয়ে নৃত্য করতে লাগলেন। এভাবেই শ্রীনিবাস মাতৃগর্ভে থেকেই নাম প্রেমে সকলকে মাতিয়েছিলেন।
তিনি শিশুকাল থেকেই পিতা ও মাতার মুখে স্ব-পার্ষদ ভগবান শ্রীগৌর হরির গুণ-কীর্তন শ্রবণ করতেন। তিনি বাল্যকালেই গৌর-পার্ষদ শ্রীনরহরি সরকার ঠাকুর ও অন্যান্য বৈষ্ণবগণের কৃপা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর মাতাকে নিয়ে চাখন্দি গ্রাম থেকে মাতামহের আলয় (দাদুর বাড়ি) যাজি গ্রামে চলে আসেন। ক্রমে ক্রমে তাঁর হৃদয়ে ভক্তি- প্রেম উদয় হতে থাকে। জগতের কোন বস্তুর প্রতি লালায়িত না হয়ে সর্বদা শ্রীগৌর হরির চরণ দর্শনের জন্য চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকতেন। তাঁর নীলাচলে যাবার ইচ্ছা হলে শ্রীনরহরি সরকার ঠাকুর ও শ্রীরঘুনন্দন ঠাকুর প্রভৃতি, গৌড়ীয় ভক্তগণের সাথে যাবার নির্দেশ দিলেন। নীলাচলে কিছুদিন অবস্থানের পর আবার তিনি গৌড় দেশে ফিরে এলেন। নবদ্বীপে যেতেই নিত্যানন্দ প্রভু ও অদ্বৈত আচার্যের সংগোপন (অতিশয় গোপন কথা) শুনে মূর্চ্ছিত হয়ে পড়লেন। চেতনা পেয়ে অগ্নি জ্বেলে মরবার জন্য প্রস্তুত হলেন। শ্রীনিবাসের কৃষ্ণপ্রেম বিহ্বল অবস্থা দেখে দুই প্রভু স্বপ্নে এসে দর্শন দিয়ে সান্ত্বনা প্রদান করলেন ও বৃন্দাবনে যাওয়ার আজ্ঞা দিলেন। মায়ের অনুমতি নিয়ে তিনি বৃন্দাবন যাত্রা করলেন এবং শ্রীগোপাল ভট্ট গোস্বামীর কাছে মন্ত্র-দীক্ষা গ্রহণ করলেন।
শ্রীনিবাস আচার্য, শ্রীশ্যামানন্দ প্রভু ও শ্রীনরোত্তম ঠাকুর-এই তিনজনেই শ্রীল জীব গোস্বামীর নিকট ভক্তি-শাস্ত্র অনুশীলন করতেন। ব্রজের গোস্বামীগণ এই তিনজনের দ্বারা গৌড়দেশে ভক্তি-গ্রন্থ প্রচারের সিদ্ধান্ত করলেন ও আদেশ দিলেন। তাঁরা গ্রন্থ নিয়ে গৌড় দেশের পথে এগোতে লাগলেন, তাঁরা বহু পথ অতিক্রম করিয়া হিন্দু রাজ্য বনবিষ্ণুপুরে আসলে রাজা বীর হাম্বী, গ্রন্থের সিন্ধুক দেখে, বহু ধনরত্ন আছে এমন ভেবে দস্যুগণকে অপহরণের নির্দেশ দিলেন। দস্যুগণ রাত্রিতে গ্রন্থের সিন্ধুক নিয়ে রাজার কাছে গেলে, রাজা সিন্ধুকে মূল্যবান গ্রন্থ সমূহ দর্শন করে অনুতপ্ত ও ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। শ্রীনিবাস আচার্য জনৈক ব্যক্তির কাছে অনুসন্ধান করে বনবিষ্ণুপুরের রাজার কাছে গ্রন্থ প্রাপ্তির সম্ভাবনা অবগত হয়ে শ্রীশ্যামানন্দ প্রভুকে উৎকলে ও শ্রীনরোত্তম ঠাকুরকে খেতুরীতে পাঠালেন এবং তিনি নিজে আমন্ত্রিত হয়ে রাজসভায় রাজা ও পারিষদ গণের কাছে ভাগবত পাঠ করলেন, পাঠ শুনে সবার চিত্ত বিগলিত হল। রাজা আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয়ে নির্জনে শ্রীনিবাস আচার্যের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, রাণীর হৃদ্য়ও অত্যন্ত ব্যকুলিত হল। শ্রীনিবাস আচার্য তাঁদের কৃপা করলেন। গ্রন্থ প্রাপ্তি সন্দেশ ও রাজার কৃপা লাভ সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রীবৃন্দাবনে, শ্রীনরোত্তম ঠাকুর ও শ্রীশ্যামানন্দ প্রভুকে সংবাদ দিলেন। শ্রীনিবাস আচার্য প্রভু বনবিষ্ণুপুর হইতে যাজিগ্রাম, কাটোয়া ও নবদ্বীপ ভ্রমণ করেন।
পরবর্তীতে শ্রীখন্ড নিবাসী শ্রীরামচন্দ্র কবিরাজ শ্রীনিবাস আচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং নাম-প্রেম প্রচার ও জীব উদ্ধার করতে থাকেন। অগণিত দুঃখী পতিত জীব চরণে আশ্রয় গ্রহণ করেন। একদিন শ্রীনিবাস আচার্য প্রভু ভাব সমাধিস্থ হলে তিন দিন কেটে যায়। অনিষ্ট চিন্তা করে সকলে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। ইতিমধ্যে সেখানে শ্রীরামচন্দ্র কবিরাজ এসে সব দেখে বললেন, আপনারা কেউ ক্রন্দন করবেন না। দেখি গুরুদেব কোন আনন্দে ডুবে আছেন। বলে পাশে বসে উনিও সমাধিস্থ হলেন। সমাধিতে দেখলেন রাধামাধবের যমুনায় জলবিহার চলছে। হঠাৎ রাধারানীর নাকের বেসর হারিয়ে যাওয়ায় সকলেই তন্নতন্ন করে খুঁজছেন। এইদিকে রামচন্দ্রও গুরু আনুগত্যে খুঁজতে লাগলেন। শ্রীগুরুর কৃপায় অল্প সময়ে পদ্মপত্র তলে খুঁজে পেলেন। এনে শ্রীগুরুদেবের হাতে দিলেন। উনি গুনমঞ্জরীকে দিলেন। গুনমঞ্জরী সমস্ত মঞ্জরীগনের প্রধান রূপমঞ্জরীকে দিলেন। রূপমঞ্জরী নিয়ে রাধারানীর নাসায় পরিয়ে দিলেন। রাধারানী জিজ্ঞাসা করলেন- কে পেয়েছে ?
এই নবদাসী বলে ইঙ্গিত করে জানালেন। রাধারানী কাছে ডেকে আদর করে নিজের চর্বিত তাম্বুল অধরামৃত প্রদান করলেন। ধ্যান ভঙ্গ হলে নিজহাতে চর্বিত তাম্বুল দেখে সকলে বিস্ময়ান্বিত হলেন। তাম্বুলের সুগন্ধে চারিদিক আমোদিত হল। গুরুদেব কে সমর্পন করলে সকলে সেই দিব্য অধরামৃত পেয়ে ধন্য হলেন।


