
রক্তে লেখা এক পরম শিবভক্ত পাহারাদারের গল্প।
অর্বুদাচল পর্বতের গভীর জঙ্গল। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝেমধ্যে বন্য পশুর হুঙ্কার। সেই বনের এক কোণে ছোট্ট এক কুটিরে বাস করতেন ভিলরাজ আহুক আর তাঁর স্ত্রী আহুকা। নুন আনতে পান্তা ফুরনোর সংসার হলেও, তাঁদের হৃদয়ে ছিল দেবাদিদেব মহাদেবের প্রতি এক পাহাড়প্রমাণ ভক্তি।
এক দুর্যোগপূর্ণ সন্ধ্যায় তাঁদের দরজায় কড়া নাড়লেন এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী। জীর্ণ শরীর, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। তিনি বিনম্রভাবে বললেন, "বাছা, আজ রাতটুকু এই অভাগাকে একটু আশ্রয় দেবে? বাইরে বড় বিপদ!"
আহুক পড়লেন মহা সংকটে। কুটিরটি ছিল এতটাই ছোট যে সেখানে বড়জোর দুজন মানুষ শুতে পারেন। আহুক ভাবলেন, "আমি গৃহস্থ হয়ে সন্ন্যাসীকে বাইরে রাখব? এ তো আমার শিবের অপমান!" তিনি স্ত্রীকে ডেকে বললেন, "তুমি আর অতিথি ভেতরে থাকো। আমি বাইরে দরজায় পাহারায় বসলাম। মহাদেব সহায় থাকলে আমার থাকতে অতিথির গায়ে কেউ আঁচড় কাটতে পারবে না।"
রাত গভীর হলো। কুটিরের ভেতর থেকে টিপটিপ করে জ্বলা প্রদীপের আলো দেখা যাচ্ছে। সন্ন্যাসী তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু বাইরে? বাইরে তখন ঘাপটি মেরে বসে আছে অরণ্যের বিভীষিকা, এক বিশালকায় ক্ষুধার্ত বাঘ!
হঠাৎ এক বিকট গর্জনে কেঁপে উঠল চারপাশ। মুহূর্তের মধ্যে বাঘটি ঝাঁপিয়ে পড়ল আহুকের ওপর। অন্ধকার রাতে শুরু হলো এক মরণপণ লড়াই। একদিকে বাঘের নখর আর বিষাক্ত দাঁত, অন্যদিকে আহুকের অটল কর্তব্যবোধ। বাঘের থাবায় আহুকের বুক চিরে রক্ত ঝরছে, সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু আহুক একটিবারের জন্যও সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেন না। কেন জানেন? পাছে তাঁর চিৎকারে ভেতরে নিশ্চিন্তে ঘুমানো অতিথি সন্ন্যাসীর ঘুম ভেঙে যায়!
নিজের রক্তে ভিজে যাওয়া মাটি আঁকড়ে ধরে আহুক শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়ে গেলেন। বাঘটি যখন তাঁকে ছিঁড়ে খাচ্ছে, তখনো আহুকের ঠোঁটে ছিল শুধু একটিই নাম "ওঁ নমঃ শিবায়"। তিনি নিজের জীবন দিলেন, কিন্তু অতিথির গায়ে একটি আঁচড়ও লাগতে দিলেন না। ভোরবেলা যখন সন্ন্যাসী আর আহুকা বাইরে এলেন, তাঁরা দেখলেন চারদিকের মাটি লাল হয়ে আছে। একপাশে পড়ে আছে আহুকের নিথর, ছিন্নভিন্ন শরীর। সন্ন্যাসী বেশধারী মহাদেব তখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি বলতে লাগলেন, "হায়! আমার সামান্য আশ্রয়ের জন্য এই ভক্ত নিজের শরীর বাঘের মুখে সঁপে দিল? আমি এ পাপ কোথায় রাখব?"
আহুকা তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। চোখের জল মুছে তিনি শান্ত গলায় বললেন, "ঠাকুর, আপনি কাঁদবেন না। অতিথিসেবা করতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া তো পরম সৌভাগ্য। আমার স্বামী আজ বীরের মতো মরেও অমর হয়ে রইলেন।" এই বলে তিনি স্বামীর চিতার আগুনে নিজেকে সঁপে দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন।
ঠিক যখন আগুনের শিখা আহুকাকে ছুঁতে যাবে, তখনই আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে এক স্বর্গীয় আলো ছড়িয়ে পড়ল। সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসী রইলেন না; জটাজালধারী, ত্রিনয়ন মহাদেব তাঁর আসল রূপে প্রকট হলেন। তিনি আহুকার হাত ধরে টেনে তুললেন আর আহুকের নিথর শরীরে হাত বুলিয়ে দিলেন।
মহাদেব গদগদ কণ্ঠে বললেন, "আহুক, তোমার মতো ভক্ত যার ঘরে আছে, সেই ঘরই আমার মন্দির। তোমার এই ত্যাগের কথা কালান্তরের মানুষ চোখের জলে মনে রাখবে। পরের জন্মে তোমরা রাজা নল আর রাণী দময়ন্তী হয়ে জন্মাবে, আর আমি তোমাদের মিলন ঘটাব।"
আসলে ঈশ্বর আমাদের থেকে বড় বড় মন্দির বা ভোগ চান না; তিনি চান এমন এক হৃদয়, যা অন্যের জন্য নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিতেও দ্বিধা করে না। আহুক তাঁর জীবন দিয়ে শিখিয়ে গেলেন, সেবাই হলো পরম ধর্ম।
জয় মহাকাল মহাকাল ॐ


