জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিটি 'অপরা একাদশী' নামে পরিচিত। শাস্ত্রীয় মতে, এই একাদশী অত্যন্ত পুণ্যদায়ী এবং এর মাহাত্ম্য অপরিসীম। 'অপার' বা অসীম পুণ্য দান করে বলেই এই একাদশীর নাম হয়েছে 'অপরা'।
ব্রহ্মপুরাণ ও অন্যান্য শাস্ত্রে এই একাদশীর যে মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে, তার মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অসীম পাপ থেকে মুক্তি
'অপরা' শব্দের অর্থ হলো যা অপার বা অসীম। এই ব্রত পালন করলে মানুষ ব্রহ্মহত্যা, পরনিন্দা, মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়া বা পরস্ত্রীর প্রতি আসক্তির মতো গুরুতর পাপ থেকেও মুক্তি পেতে পারে। এমনকি যারা মিথ্যা শাস্ত্র রচনা করে বা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে, তারাও এই ব্রত পালনে শুদ্ধ হয়।
২. রাজকীয় পুণ্য ফল
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, অপরা একাদশী পালন করলে যে ফল পাওয়া যায় তা নিচের পুণ্যকর্মের সমান:
কার্তিক মাসে পুষ্কর স্নান।
মকর সংক্রান্তিতে প্রয়াগে স্নান।
কাশীধামে শিবরাত্রি পালন।
গয়াতে পিণ্ডদান।
গজদান, অশ্বদান বা সুবর্ণ দানের সমান পুণ্য।
৩. পরলোকে সদ্গতি ও বৈকুণ্ঠ লাভ
যমরাজ ও প্রেতজন্মের ভয় থেকে মুক্তি পেতে অপরা একাদশী শ্রেষ্ঠ। যারা নিষ্ঠার সাথে এই ব্রত পালন করেন, তাদের যমালয়ে যেতে হয় না; বরং তাঁরা সরাসরি বৈকুণ্ঠ ধামে স্থান পান। এটি মানুষের জীবনের দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করে এবং পরম সুখ প্রদান করে।
৪. অপরা একাদশীর ব্রতকথা (সংক্ষেপে)
প্রাচীনকালে মহীধ্বজ নামে এক ধর্মপ্রাণ রাজা ছিলেন। তাঁর ছোট ভাই বজ্রধ্বজ ছিল অত্যন্ত পাপিষ্ঠ ও নিষ্ঠুর। সে তার দাদাকে হত্যা করে একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে পুঁতে রাখে। অকাল মৃত্যু ও অন্যায়ের শিকার হওয়ায় রাজা মহীধ্বজ সেই গাছেই প্রেতাত্মা হয়ে বসবাস করতে শুরু করেন।
একদিন ধৌম্য ঋষি সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় রাজার দুঃখের কথা জানতে পারেন এবং নিজের তপোবলে রাজার প্রেত হওয়ার কারণ বুঝতে পারেন। দয়াপরবশ হয়ে ঋষি রাজাকে সেই প্রেতযোনি থেকে মুক্ত করার জন্য নিজে অপরা একাদশী পালন করেন এবং সেই পুণ্যফল রাজাকে দান করেন। এই পুণ্যপ্রভাবে রাজা মহীধ্বজ প্রেতদেহ ত্যাগ করে দিব্যদেহ ধারণ করেন এবং দিব্য বিমানে চড়ে স্বর্গে গমন করেন।
অপরা একাদশীর পালন বিধি
উপবাস: দশমী তিথি থেকেই সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করতে হয় এবং একাদশীর দিন সম্পূর্ণ নির্জলা বা ফলমূল খেয়ে উপবাস পালন করতে হয়।
বিষ্ণু পূজা: এই দিনে ভগবান বিষ্ণুর 'ত্রিবিক্রম' রূপের পূজা করা হয়। তুলসী পাতা, ধূপ-দীপ ও চন্দন দিয়ে পূজা করা শ্রেষ্ঠ।
জাগরণ ও জপ: একাদশীর রাতে জেগে থেকে ভগবানের নাম সংকীর্তন ও শাস্ত্র পাঠ করা অত্যন্ত ফলদায়ক।
দান: পরদিন দ্বাদশী তিথিতে সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণ বা দরিদ্রকে ভোজন করিয়ে বা দান করে ব্রত ভঙ্গ (পারণ) করতে হয়।
যারা জীবনে অনেক ভুল বা পাপ করে অনুতপ্ত এবং যারা মুক্তি ও শান্তি খুঁজছেন, তাঁদের জন্য অপরা একাদশী এক পরম আশির্বাদ।


