꧁◼️প্রশ্ন:১১ ভগবানের উগ্ররূপের পরিচয় কি? (১১/৩১) ◼️꧂
****শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – একাদশ অধ্যায় – বিশ্বরূপদর্শনযোগ*****
অর্জুনের একাদশতম প্রশ্ন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের একত্রিংশতি নং শ্লোকে উল্লেখ করেছেন—
|অর্জুন উবাচ |
❝ আখ্যাহি মে কো ভবান্-উগ্ররূপো নমোহস্তু তে দেববর প্রসীদ।
বিজ্ঞাতুম্ ইচ্ছামি ভবন্তম্ আদ্যম্ ন হি প্রজানামি তব প্ৰবৃত্তিম্॥ ❞
━┉┈┈(ভগবদ্গীতা, ১১/৩১)
অনুবাদ: “উগ্রমূর্তিরূপে তুমি কে, কৃপা করে আমাকে বল। হে দেবশ্রেষ্ঠ! তোমাকে নমস্কার করি, তুমি প্রসন্ন হও। তুমি হচ্ছ আদিপুরুষ। আমি তোমার প্রবৃত্তি অবগত নই, আমি তোমাকে বিশেষভাবে জানতে ইচ্ছা করি।”
|শ্রীভগবানুবাচ|
❝ কালঃ-অস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো লোকান্ সমাহর্তম্-ইহ প্রবৃত্তঃ ।
ঋতে-অপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে যে-অবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ॥৩২॥ ❞
অনুবাদ: “পরমেশ্বর ভগবান বললেন━ আমি লোকবিনাশক (লোকক্ষয়কারী) প্রবৃদ্ধ কাল, এখন লোকসংহারে প্রবৃত্ত হয়েছি। তুমি যদি যুদ্ধ না করো , তবুও তোমরা (পাণ্ডবেরা) ছাড়া উভয়পক্ষের কোনো যোদ্ধাই জীবিত থাকবে না অর্থাৎ এঁদের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।”
✸ আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ ✸
===================
🌸অর্জুন একাদশতম প্রশ্নে ভগবানকে বলছেন, “উগ্রমূর্তি তুমি কে, কৃপা করে আমাকে বল। হে দেবশ্রেষ্ঠ! তোমাকে নমস্কার করি, তুমি প্রসন্ন হও। তুমি হচ্ছ আদিপুরুষ। আমি তোমার প্রবৃত্তি অবগত নই, আমি তোমাকে বিশেষভাবে জানতে ইচ্ছা করি।”
🌸এখন প্রশ্ন হতে পারে অর্জুনের মনে এই রকম প্রশ্নের উদয় হলো কেন? তার সহজ সরল উত্তর পেতে গেলে আমাদের আগের শ্লোকের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা দেখতে পাই দশম অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে ভগবান বলেছেন,
অথবা বহুনৈতেন কিং জ্ঞাতেন তব-অর্জুন।
বিষ্টভ্য-অহম্-ইদম্ কৃৎস্নম্-একাংশেন স্থিতো জগৎ।। (১০/৪২)
“হে অর্জুন! অথবা এই প্রকার বহু জ্ঞানের দ্বারা তোমার কি প্রয়োজন? আমি আমার এক অংশের দ্বারা সমগ্র জগতে ব্যাপ্ত হয়ে অবস্থিত আছি।” এই কথা শোনার পর অর্জুনের মনে প্রশ্ন জাগল কিভাবে তিনি সর্বব্যাপ্ত হয়ে আছেন তা আমি নিজের চোখে দেখতে চাই।
এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন তা হলে কি ভগবানের কথায় অর্জুনের সংশয় আছে—না, অর্জুন ভগবানের যশ যাতে মানুষ আরো ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারে সেই কারণে দেখতে চাইছেন। কারণ পরবর্তীতে যদি কেউ নিজেকে ভগবান বলে জাহির করতে চান তাহলে তাকে অবশ্যই বিশ্বরূপ দেখাতে হবে। তাছাড়া ভগবানের অদ্ভূত কার্যকলাপ দেখে মানুষ সহজেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে এই রকম অনেক কারণকে কেন্দ্র করেই অর্জুন ভগবানের বিশ্বরূপ দেখতে চেয়েছিলেন। আর ভক্তবৎসল পরম করুণাময় ভগবান ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করার জন্য ১১।৫-৭ নং শ্লোকে চারবার ‘পশ্য’ মানে ‘দ্যাখো’ কথাটি উল্লেখ করেছেন। অর্জুন দশম অধ্যায়ের গুণাগুণ শ্রবণ করে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ভগবানকে ‘পদ্মপলাশলোচন’ বলে সম্বোধন করে বিশ্বরূপ দেখার অভিলাষ করলেন।
🌸ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন —
ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুম্-অনেন-এব স্বচক্ষুষা।
দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগম্-ঐশ্বরম্॥১১/৮॥
“কিন্তু তুমি তোমার বর্তমান চক্ষুর দ্বারা আমাকে দর্শন করতে সক্ষম হবে না। তাই, আমি তোমাকে দিব্যচক্ষু প্রদান করছি। তুমি আমার অচিন্ত্য যৌগেশ্বর্য দর্শন কর।” দিব্য চক্ষু মানে দেবতাদের চক্ষু। তাহলে আমাদের মনে স্বাভাবিক প্রশ্ন আসবে অর্জুনের আগে কোন্ চক্ষু ছিল? তার উত্তর হচ্ছে অর্জুনের চক্ষু ছিল চিন্ময় কারণ ভগবানের শরীর ছিল পূর্ণ সৎ, চিৎ ও আনন্দময়। ভগবানের আংশিক প্রকাশ ছিল এই বিশ্বরূপ। এই বিশ্বরূপ হচ্ছে ভগবানের জড়রূপ, তাই ভগবান অর্জুনকে দান করলেন – দেবতাদের চক্ষু বা দিব্যচক্ষু যা জড় রূপ দেখতে সক্ষম হবে।
ভগবান অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখালেন একই রথের উপর উপবিষ্ট হয়ে দর্শন করছিলেন, হাজার হাজার গ্রহলোক শ্রীকৃষ্ণের শরীরে অবস্থান করছে—তাই অর্জুন ভগবানকে করজোড়ে প্রণাম নিবেদন করছেন। অর্জুন দেখছেন, ঊর্ধ্বলোক ব্রহ্মলোক থেকে শুরু করে নিম্নলোক অনন্তশেষ পর্যন্ত অর্থাৎ সনাতন ধর্মের রক্ষা এবং সনাতন পরমপুরুষ।
🌸অর্জুনই কেবল বিশ্বরূপ দর্শন করেন নি, অন্যান্য গ্রহলোকের অধিবাসীরাও দর্শন করেছিলেন। কিন্তু অন্যান্য গ্রহলোকের অধিবাসীরা এই বিশ্বরূপ দর্শন করে ভয় পান নি কিন্তু অর্জুন কেন ভয় পেলেন? তার উত্তর হল ভগবান অর্জুনকে কেবল দিব্যচক্ষু প্রদান করেছিলেন কিন্তু ‘দিব্যমন’ প্রদান করেন নি—তাই অর্জুনের মন ভয়ের দ্বারা বিচলিত হয়েছিল। তাই অর্জুন ভগবানকে ‘হে দেবেশ’, ‘হে জননিবাস’ বলে সম্বোন্ধন করে বলেছেন, আমি শান্তি পাচ্ছি না। অর্জুন দেখলেন, ভগবানের জলন্ত মুখবিবরে কি ভাবে দুই পক্ষের রথী ও মহারথীরা প্রবেশ করছেন। তিনি এও দেখলেন পিতামহ ভীষ্ম, গুরুদেব দ্রোণাচার্য ও কর্ণও কি ভাবে প্রবেশ করছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, কেবল তিন জনের নাম কেন বললেন? এর উত্তর হচ্ছে পিতামহ ও গুরুদেবের প্রতি অর্জুনের প্রবল আসক্তি ছিল আর কর্ণ হচ্ছে তার প্রধান প্রতিদ্বন্ধী । অর্জুন যদিও শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর সখা ও পরমেশ্বর বলে জানতেন, তবুও শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা প্রদর্শিত অসংখ্য মূর্তি দেখে তিনি হতবুদ্ধি হয়ে এই রকম প্রশ্ন করেছিলেন।
🌸ভগবান অর্জুনের প্রশ্ন শ্রবণ করে বললেন —
কালঃ-অস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো লোকান্ সমাহর্তম্-ইহ প্রবৃত্তঃ ।
ঋতে-অপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে যে-অবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ॥১১/৩২॥
“শ্রীভগবান বললেন—আমি লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধ কাল এবং এই সমস্ত লোক সংহার করতে এক্ষণে প্রবৃত্ত হয়েছি। তোমরা (পাণ্ডবেরা) ছাড়া উভয় পক্ষীয় সমস্ত যোদ্ধারাই নিহত হবে।” শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন” নিমিত্ত মাত্র হয়ে যুদ্ধ কর এবং যশ লাভ কর। ইতিমধ্যেই আমি তাদের হিত করে রেখেছি। ভগবান বোঝাতে চাইলেন, যারা আমার দ্বারা ইতিপূর্বেই নিহত হয়ে আছে তাদের তুমি হত্যা কর। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, জয়দ্রথ এবং অন্যান্য বীরগণ পূর্বেই আমার দ্বারা নিহত হয়েছে। সুতরাং তুমি তাদের বধ কর এবং বিচলিত হয়ো না। তুমি যুদ্ধে শত্রুদের নিশ্চয়ই জয় করবে। অতএব যুদ্ধ কর। (গীতা ১১।৩৪)
🌸অর্জুন ভুলুণ্ঠিত হয়ে ভগানের কাছে তাঁর পূর্ব-কার্যকলাপের জন্য ক্ষমা ও কৃপা ভিক্ষা চেয়ে ভগবানের চতুর্ভূজ রূপ দর্শন করতে চাইলেন। —প্রথমতঃ এর থেকে এটি প্রমাণ করে যে, শ্রীকৃষ্ণ যে কোন রূপ ধারণ করতে সক্ষম। —দ্বিতীয়তঃ ভগবানের বিশ্বরূপ হচ্ছে ভগবানের আংশিক প্রকাশ, তার ঊর্ধ্বরূপ চতুর্ভূজ রূপ দর্শন করিয়ে পরে দ্বিভূজ শ্যামসুন্দর রূপ দর্শন করিয়েছিলেন।
এরপর শ্রীভগবান বললেন, “হে অর্জুন, অনন্য ভক্তির দ্বারাই যে কেউ আমাকে দর্শন করতে সমর্থ হয় এবং আমার চিন্ময় ধামে প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। ”


