👉 সনাতন ধর্মে শ্রীকৃষ্ণকে 'স্বয়ং ভগবান' এবং 'ষোড়শ কলাপূর্ণ' (১৬টি গুণের অধিকারী) বলা হয়। অন্যান্য অবতারগণ নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ভগবানের আংশিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ হলেও, কৃষ্ণকে পূর্ণ শক্তির আধার মনে করা হয়। তাঁর পূর্ণমাত্রায় 'শ্রী' বা ঐশ্বর্য থাকার প্রধান প্রমাণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ষড়ৈশ্বর্যের পূর্ণ বিকাশ
বিষ্ণুপুরাণ ও শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে, 'ভগবান' তিনিই যার মধ্যে ছয়টি ঐশ্বর্য পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। শ্রীকৃষ্ণের জীবনে এই ছয়টি গুণের চরম বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়:
ঐশ্বর্য: তিনি অধীশ্বর। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বিশ্বরূপ দর্শনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে পুরো মহাবিশ্ব তাঁর মধ্যেই অবস্থিত।
বীর্য (শক্তি): শৈশবে পুতনা বধ থেকে শুরু করে কংস নিধন এবং জরাসন্ধের মতো প্রতাপশালী রাজাদের দমন—তার অসীম শক্তির প্রমাণ।
যশ (খ্যাতি): হাজার বছর ধরে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে তাঁর নাম ও লীলা কীর্তিত হচ্ছে।
শ্রী (সৌন্দর্য): শ্রীকৃষ্ণের রূপকে বলা হয় 'ত্রিভুবন মোহন'। তাঁর বাঁশির সুর এবং রূপ কেবল মানুষ নয়, প্রকৃতিকেও মুগ্ধ করত।
জ্ঞান: শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হলো জ্ঞানের চরম শিখর। যুদ্ধক্ষেত্রের মতো অস্থির পরিবেশে তিনি যে জীবনদর্শন দিয়েছেন, তা আজও অতুলনীয়।
বৈরাগ্য: এত ঐশ্বর্য ও ক্ষমতার অধিপতি হয়েও তিনি নিজে কোনোদিন রাজা হননি (যাদবদের পরামর্শদাতা ছিলেন) এবং সবশেষে দেহত্যাগের মাধ্যমে পরম বৈরাগ্য প্রদর্শন করেছেন।
২. ষোড়শ কলা (১৬টি গুণ)
বলা হয়, পূর্ণিমার চাঁদ যেমন ১৬ কলায় পূর্ণ থাকে, শ্রীকৃষ্ণও তেমনি ১৬টি গুণের অধিকারী ছিলেন। যেখানে অন্যান্য অবতারগণ (যেমন শ্রীরামচন্দ্র ১২ কলায় প্রকাশিত) নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে লীলা করেছেন, সেখানে কৃষ্ণ সব সীমা অতিক্রম করেছেন:
প্রজ্ঞা, 2. ধৈর্য, 3. ক্ষমা, 4. ন্যায়, 5. অপরিবর্তনশীলতা, 6. দানশীলতা, 7. বিষাদহীনতা, 8. সংযম, 9. নিষ্ঠা, 10. স্মৃতি, 11. দয়া, 12. শান্তি, 13. বিনয়, 14. আস্তিক্য, 15. তেজ, 16. সহনশীলতা।
৩. সর্বাত্মক লীলার প্রকাশ
শ্রীকৃষ্ণের জীবনে মানব জীবনের প্রতিটি রসের (ভক্তি, বাৎসল্য, সখ্য, মাধুর্য ও বীর রস) পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি একই সাথে আদর্শ সন্তান, অনুগত বন্ধু, দক্ষ রাজনীতিবিদ, মহান দার্শনিক এবং পরমেশ্বর।
শ্রীমদ্ভাগবতের প্রসিদ্ধ শ্লোক: "এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং।" (অর্থাৎ: অন্যান্য অবতারগণ পরমপুরুষের অংশ বা কলা মাত্র, কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান।)
৪. গীতার জ্ঞানদান
শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র অবতার যিনি যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে নিজেকে সরাসরি 'পরমেশ্বর' হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং ভক্তি, কর্ম ও জ্ঞানযোগের যে সমন্বয় দেখিয়েছেন, তা তাঁর পূর্ণতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।


