🙏সনাতন ধর্ম ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দর্শন অনুযায়ী, 'আত্মার নিত্যধর্ম' বলতে সেই গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে বোঝায় যা চিরন্তন, অবিনশ্বর এবং অপরিবর্তনীয়। প্রকৃতির সব কিছু পরিবর্তিত হলেও আত্মা কখনো পরিবর্তিত হয় না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার নিত্যধর্ম সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এর প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অবিনশ্বরতা (Immortality)
আত্মার সবচেয়ে বড় নিত্যধর্ম হলো এর কোনো বিনাশ নেই। শ্লোক অনুসারে:
"নৈনং ছিন্দন্তি শাস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ। ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ॥" (অর্থ: আত্মাকে অস্ত্র কাটতে পারে না, আগুন পোড়াতে পারে না, জল ভেজাতে পারে না এবং বায়ু শুকাতে পারে না।)
২. জন্ম-মৃত্যু রহিত (Unborn and Eternal)
শরীরের জন্ম ও মৃত্যু আছে, কিন্তু আত্মার জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। আত্মা অজ (জন্মহীন), নিত্য (সর্বদা বিদ্যমান), শাশ্বত (পুরাতন হলেও নতুন) এবং পুরাণ। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা বিনষ্ট হয় না।
৩. অপরিবর্তনীয়তা (Immutability)
মানুষের শরীর শৈশব থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়, কিন্তু আত্মা সবসময় একই থাকে। আত্মার কোনো বৃদ্ধি বা ক্ষয় নেই। এটি কেবল এক শরীর থেকে অন্য শরীরে স্থানান্তরিত হয়, ঠিক যেমন আমরা পুরনো পোশাক ত্যাগ করে নতুন পোশাক পরিধান করি।
৪. পরমাত্মার অংশ (Relationship with Paramatma)
আত্মার স্বরূপ হলো সে পরমাত্মার (ঈশ্বর) একটি ক্ষুদ্র অংশ। আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেমন আগুনেরই অংশ এবং গুনে এক, তেমনি আত্মাও গুণগতভাবে পরমেশ্বরের মতোই সচ্চিদানন্দ (সৎ-চিৎ-আনন্দ)।
সৎ: যা চিরকাল থাকে।
চিৎ: যা জ্ঞানময় বা সচেতন।
আনন্দ: যা পরম সুখের আধার।
৫. নিস্পৃহ ও নির্লিপ্ত
আত্মা নিজে কোনো কর্ম করে না এবং কর্মফলের দ্বারা লিপ্ত হয় না। এটি কেবল শরীরের সাক্ষী হিসেবে অবস্থান করে। শরীরের ইন্দ্রিয়গুলো যখন কোনো কাজ করে, আত্মা সেখানে চৈতন্য বা প্রাণশক্তি জোগায় মাত্র।
সহজ কথায় তাৎপর্য: আত্মার নিত্যধর্ম হলো 'সেবা'। আধ্যাত্মিক বিচারে বলা হয়, 'জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্যদাস'। অর্থাৎ, শুদ্ধ অবস্থায় আত্মা সবসময় পরমাত্মার সান্নিধ্যে থাকতে চায় এবং ভক্তির মাধ্যমে তাঁর সেবা করাই আত্মার প্রকৃত ও স্বাভাবিক ধর্ম।


