একাদশী কোনো সাধারণ পঞ্জিকার তারিখ বা সময় নয়; সনাতন শাস্ত্র (বিশেষ করে পদ্মপুরাণ) অনুযায়ী, একাদশী হলেন ভগবান বিষ্ণুর দেহ থেকে উৎপন্ন এক দিব্য দেবী এবং তাঁরই এক বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তি।
একাদশী দেবীর পরিচয় ও তাঁর স্বরূপ নিচে আলোচনা করা হলো —
১. একাদশী দেবীর পরিচয় (জন্মকথা)
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, একবার ভগবান বিষ্ণু 'মুর' নামক এক শক্তিশালী দানবের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বদরিকাশ্রমের এক গুহায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন মুর দানব তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করতে উদ্যত হলে, বিষ্ণুর শরীর থেকে এক তেজস্বিনী দেবী আবির্ভূত হন। এই দেবী তাঁর এক হুঙ্কারে মুর দানবকে ভস্মীভূত করে দেন। ভগবান বিষ্ণু জেগে উঠে এই দেবীর বীরত্বে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন।
যেহেতু চন্দ্রমাসের একাদশতম দিনে (তিথিতে) তাঁর প্রকাশ ঘটেছিল, তাই ভগবান তাঁর নাম দেন 'একাদশী'।
২. একাদশী — ভগবানের অতি প্রিয় শক্তি
একাদশী দেবী ভগবান বিষ্ণুর অত্যন্ত প্রিয়। শাস্ত্র মতে, তিনি হলেন ভগবানের ভক্তি-শক্তি। বলা হয়, একাদশী ব্রত পালন করলে একাদশী দেবী সন্তুষ্ট হন এবং তিনি সরাসরি ভক্তকে ভগবানের চরণে পৌঁছে দেন। এই কারণে একাদশীকে 'মাধব-তিথি' বা 'হরি-বাসর' (ভগবানের দিন) বলা হয়।
৩. পাপ বিনাশকারিণী দেবী
একাদশী দেবীকে ভগবানের আশীর্বাদ দেওয়া হয়েছে যে, এই দিনে যারা অন্নাহার ত্যাগ করে তাঁর আরাধনা করবে, দেবী নিজে তাদের সমস্ত পাপ ভস্ম করে দেবেন। কথিত আছে, ব্রহ্মহত্যা বা অন্যান্য কঠিন পাপও এই দেবীর কৃপায় দূর হয়ে যায়।
৪. একাদশীরূপী ব্রত
আধ্যাত্মিক বিচারে একাদশী কোনো ব্যক্তি বা দেবীর মূর্তির চেয়ে তাঁর 'ব্রত' রূপেই বেশি জনপ্রিয়। একাদশী দেবীর মূল বার্তা হলো—শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয়, বরং ইন্দ্রিয়গুলোকে সংযত করে মনের ময়লা পরিষ্কার করা।
একাদশী দেবীর মাহাত্ম্য সম্পর্কে একটি বিশেষ তথ্য:
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, একাদশী তিথিতে বিশ্বের সমস্ত পাপ গিয়ে অন্ন বা শস্যদানার ভেতরে আশ্রয় নেয়। তাই একাদশীর দিন অন্ন ভক্ষণ করা মানে হলো পাপ ভক্ষণ করা। একাদশী দেবী এই দিনটিতে মানুষকে অন্ন থেকে দূরে রেখে আধ্যাত্মিক সুধা পান করার সুযোগ করে দেন।
একাদশী হলেন ভগবানের শরীর থেকে জাত এক পরমা সুন্দরী ও তেজস্বিনী দেবী, যিনি ভক্তদের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি ধ্বংস করে তাদের ভক্তিপথে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি কেবল একটি তিথি নন, তিনি স্বয়ং ভক্তি জননী।


