অক্ষয় তৃতীয়া হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এবং শুভ একটি তিথি। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিকে 'অক্ষয় তৃতীয়া' বলা হয়। 'অক্ষয়' শব্দের অর্থ হলো যা ক্ষয় হয় না বা যা চিরস্থায়ী। বিশ্বাস করা হয় যে, এই দিনে কোনো শুভ কাজ করলে তার ফল কখনও ফুরিয়ে যায় না।
এই দিনটি কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর পেছনে কী কী আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো —
১. কেন এটি 'অক্ষয়'?
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এই শুভ তিথিতেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সূচনা হয়েছিল:
ত্রেতা যুগের শুরু: এই দিন থেকেই ত্রেতা যুগের সূচনা হয়েছিল বলে মানা হয়।
গঙ্গা মর্ত্যে আগমন: ভগীরথের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে গঙ্গা দেবী এই দিনেই স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেছিলেন।
গণেশ ও মহাভারত: মহর্ষি বেদব্যাস এই দিনেই গণেশকে সাথে নিয়ে মহাভারত রচনার কাজ শুরু করেছিলেন।
অক্ষয় পাত্র লাভ: বনবাসকালে পাণ্ডবরা যখন অন্নাভাবে ভুগছিলেন, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীকে 'অক্ষয় পাত্র' দান করেছিলেন, যে পাত্রের খাবার কখনো শেষ হতো না।
২. শ্রীকৃষ্ণ ও সুদানার মিলন
অক্ষয় তৃতীয়ার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় কাহিনী হলো শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর দরিদ্র বন্ধু সুদানার (সুদামা) মিলন। সুদানা একমুঠো খুদ নিয়ে কৃষ্ণের কাছে এসেছিলেন। কৃষ্ণ সেই উপহার গ্রহণ করে সুদানা না চাইতেই তাঁকে অঢেল সম্পদ দান করেছিলেন। এই ঘটনাটি স্মরণ করে মানুষ এই দিনে দান-ধ্যান করে থাকে।
৩. হালখাতা ও ব্যবসা
বাঙালি ব্যবসায়ীদের কাছে অক্ষয় তৃতীয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনেই তারা নতুন বছরের ব্যবসার হিসাব শুরু করেন, যাকে 'হালখাতা' বলা হয়। ব্যবসায়ীরা লক্ষ্মী ও গণেশের পূজা করেন এবং মনে করেন এই দিনে খাতা খুললে সারা বছর ব্যবসায় শ্রী বজায় থাকবে।
৪. পূজা ও দান-ধ্যান
এই দিনে মূলত ভগবান বিষ্ণু ও লক্ষ্মী দেবীর পূজা করা হয়। অনেক জায়গায় এদিন বিশেষ কিছু কাজ করা শুভ মনে করা হয়:
দান: চাল, ডাল, জল বা ছাতা দান করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ।
সোনা কেনা: অনেকে মনে করেন এদিন সোনা বা মূল্যবান ধাতু কিনলে সংসারে সমৃদ্ধি অক্ষয় হয়ে থাকে।
পিতৃ তর্পণ: এই দিনে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জলদান বা তর্পণ করারও রেওয়াজ আছে।
৫. পুরীর রথযাত্রা
উড়িষ্যার জগন্নাথধামে এই দিনটি বিশেষ ধুমধাম করে পালন করা হয়। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকেই জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার জন্য রথ তৈরির কাজ শুরু হয়।
অক্ষয় তৃতীয়া কেবল সোনা কেনা বা ব্যবসার দিন নয়, এটি মূলত ত্যাগ, দান এবং নতুন করে পুণ্য অর্জনের দিন। যেহেতু আপনি শ্রীকৃষ্ণের চরণে ভক্তি এবং শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে জানতে আগ্রহী, তাই আপনার জন্য এই দিনটি বিশেষ প্রার্থনার এবং ভগবানের কাছে ভক্তি ভিক্ষা করার একটি শ্রেষ্ঠ সময় হতে পারে।


