ইসকন (ISKCON) বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের মূল ভিত্তি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব, যেখানে শ্রীকৃষ্ণকে 'স্বয়ং ভগবান' বা পরমেশ্বর হিসেবে মান্য করা হয়। তবে বিষয়টি কেবল "কৃষ্ণ কৃষ্ণ" করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দর্শন ও কর্মকাণ্ড বেশ গভীর ও বিস্তৃত —
১. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আদর্শ
ইসকন মূলত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর (যাঁকে তারা কৃষ্ণ ও রাধার সম্মিলিত রূপ মনে করেন) প্রচারিত ভক্তিযোগের শিক্ষা অনুসরণ করে। তাদের প্রধান মন্ত্র হলো হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র, যা তারা বিশ্বাস করে কলিযুগের মানুষের মুক্তির প্রধান উপায়।
২. শাস্ত্রীয় শিক্ষা (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও ভাগবতম)
তারা কেবল নাম জপ নয়, বরং শাস্ত্রীয় জ্ঞানের ওপর অনেক জোর দেয়। বিশেষ করে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতম—এই দুটি গ্রন্থের শিক্ষা প্রচার করা তাদের অন্যতম প্রধান কাজ। তারা একে একটি বিজ্ঞানসম্মত জীবনধারা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।
৩. অসাম্প্রদায়িক সেবামূলক কাজ
ইসকনের কিছু বড় মাপের মানবিক কার্যক্রম রয়েছে যা কেবল ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়:
ফুড ফর লাইফ (Food for Life): এটি বিশ্বের বৃহত্তম নিরামিষ খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দুস্থদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
শিক্ষা ও চরিত্র গঠন: যুবকদের মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখা এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য তারা বিভিন্ন সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করে।
৪. ভক্তিযোগের প্রয়োগ
তাদের মতে, ভক্তি মানে কেবল মন্দিরে বসে থাকা নয়। বরং কর্মকে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত করা। অর্থাৎ একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা কৃষক—সবাই নিজ নিজ কাজ ঠিকভাবে করেও কৃষ্ণের সেবা করতে পারেন।
৫. অন্যান্য দেবদেবী সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
ইসকন অনুসারীরা অন্য দেবদেবীদের (যেমন: শিব, গণেশ বা দুর্গা) অবজ্ঞা করেন না। তবে তারা মনে করেন, শ্রীকৃষ্ণই পরম উৎস এবং অন্য দেবদেবীরা তাঁর গুণাবলির বিভিন্ন প্রকাশ বা শক্তিশালী গুণধর প্রতিনিধি (Demigods)। তাই তারা সরাসরি কৃষ্ণের ভক্তির মাধ্যমেই সবকিছুর উৎস খুঁজে পেতে চান।
তাই বলা যায়, কৃষ্ণের নাম জপ করা তাদের প্রধান সাধনা হলেও, এর পেছনে রয়েছে একটি সুশৃঙ্খল দর্শন, যা মূলত নিরামিষ আহার, অহিংসা, এবং পারমার্থিক শৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।


