শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে অহিংসার পরিপন্থী মনে হলেও, এর গভীরে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দর্শন কাজ করে। বিষয়টি বোঝার জন্য....
১. ধর্মযুদ্ধ বনাম ব্যক্তিগত সহিংসতা
গীতার মূল ভিত্তি কোনো সাধারণ ভূমি বা ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এটি একটি ধর্মযুদ্ধ। কৌরবরা অধর্ম, অন্যায় এবং দুর্নীতির পথ বেছে নিয়েছিল। পাণ্ডবরা সবরকম আপস করার চেষ্টা করার পরও যখন শান্তি অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন সমাজ থেকে অধর্ম দূর করতে অস্ত্র তুলে নেওয়া অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। শ্রীকৃষ্ণের মতে, অন্যায় সহ্য করাও অন্যায়।
২. আত্মার অবিনশ্বরতা
অর্জুন যখন শোকাতুর হয়ে স্বজনদের হত্যার কথা ভাবছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে পরম সত্য মনে করিয়ে দেন:
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্নাযং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ। (আত্মা কখনও জন্মায় না বা মরে না...)
তিনি অর্জুনকে বোঝান যে, শরীর নশ্বর কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর। তাই এই যুদ্ধ কোনো প্রাণ ধ্বংসের ঘটনা নয়, বরং এটি কেবল জীর্ণ পোশাক ত্যাগের মতো শরীরের পরিবর্তন মাত্র।
৩. স্বধর্ম ও কর্তব্যের পালন
অর্জুন ছিলেন একজন ক্ষত্রিয়। শাস্ত্র মতে, সমাজের সুরক্ষা এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করা ক্ষত্রিয়ের প্রধান ধর্ম। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তার ব্যক্তিগত আবেগ বা মায়া কাটিয়ে উঠে অর্পিত দায়িত্ব (Duty) পালন করতে বলেছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে পালিয়ে যাওয়া অর্জুনের জন্য কাপুরুষতা এবং অধর্ম হিসেবে গণ্য হতো।
৪. নিষ্কাম কর্মের দর্শন
শ্রীকৃষ্ণ অহিংসার এক নতুন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, যদি কোনো কাজ ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাগ বা বিদ্বেষ ত্যাগ করে কেবল নিষ্কামভাবে (ফল লাভের আশা ছাড়া) কর্তব্যের খাতিরে করা হয়, তবে তা হিংসা নয়। অর্জুনকে বলা হয়েছিল তিনি যেন নিজেকে কেবল ঈশ্বরের হাতের যন্ত্র হিসেবে মনে করেন।
৫. অহিংসার প্রকৃত অর্থ
বেদে বলা হয়েছে "অহিংসা পরম ধর্ম", তবে এর পরের অংশটি হলো "ধর্মহিংসা তথৈব চ"। অর্থাৎ, ধর্মের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে যে বলপ্রয়োগ করা হয়, তাও ধর্মেরই অংশ। গীতায় অহিংসা মানে মানসিক আসক্তিহীনতা। সমাজ থেকে চরম অশুভ শক্তিকে নির্মূল করতে অনেক সময় অস্ত্র ধরা শান্তিরক্ষারই একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।
সারসংক্ষেপে, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ করতে বলেছিলেন যাতে অধর্মের বিনাশ এবং ধর্মের সংস্থাপন হয়। এটি কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর একটি মহাজাগতিক শিক্ষা ছিল।


