শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫৪ থেকে ৭২ নম্বর শ্লোকে 'স্থিতপ্রজ্ঞ' ব্যক্তির বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। অর্জুন যখন শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, একজন স্থিরবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কী এবং তিনি কীভাবে কথা বলেন বা চলেন, তার উত্তরে কৃষ্ণ এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন।
সহজ কথায়, 'স্থিতপ্রজ্ঞ' হলেন সেই ব্যক্তি যার বুদ্ধি বা চেতনা পরম সত্যে স্থির এবং যিনি জীবনের দ্বন্দ্বে বিচলিত হন না। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. কামনাবাসনা ত্যাগ
স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি মনের সমস্ত জাগতিক কামনা-বাসনা সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেন। তিনি নিজের আত্মার মধ্যেই নিজে সন্তুষ্ট থাকেন। বাইরের কোনো বস্তু বা পরিস্থিতি তার সুখের কারণ হয় না।
২. সুখে-দুঃখে অবিচল
একজন স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি দুঃখে বিচলিত হন না এবং সুখেও উল্লসিত বা আসক্ত হন না। অনুকূল বা প্রতিকূল—উভয় পরিস্থিতিতেই তার মানসিক অবস্থা একই রকম থাকে। তিনি ভয়, রাগ এবং আসক্তি থেকে মুক্ত।
৩. ইন্দ্রিয় সংযম
গীতার ভাষায়, কচ্ছপ যেমন বিপদের আভাস পেলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো খোলসের ভেতরে গুটিয়ে নেয়, স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিও ঠিক তেমনি ইন্দ্রিয়সমূহকে (চোখ, কান, জিহ্বা ইত্যাদি) তাদের বিষয়বস্তু থেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। অর্থাৎ, তিনি ইন্দ্রিয়ের দাস নন, বরং ইন্দ্রিয়রাই তার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৪. আসক্তিহীনতা
সাধারণ মানুষ বিষয়ের চিন্তা করতে করতে তাতে আসক্ত হয়ে পড়ে, আর আসক্তি থেকে কামনার জন্ম হয়। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি জগতের সবকিছুর মধ্যে থেকেও কোনো কিছুতেই অন্তরের টান অনুভব করেন না। তিনি জানেন যে জগতের সবকিছুই পরিবর্তনশীল।
৫. পরম শান্তিতে অবস্থান
যিনি অহংকার ও মমত্ববোধ (এটি আমার, ওটি আমার—এই বোধ) ত্যাগ করেছেন, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন। স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি মোহমুক্ত হয়ে 'ব্রাহ্মী স্থিতি' লাভ করেন, যা তাকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রশান্ত রাখে।
একটি সহজ উদাহরণ: সমুদ্রের যেমন কোনো পরিবর্তন হয় না—অজস্র নদীর জল এসে তাতে মিশলেও সমুদ্র যেমন শান্ত ও স্থির থাকে, স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির মনও ঠিক তেমনই। বাইরের জগতের হাজারো উত্তেজনা বা প্রলোভন তার অন্তরের শান্তিতে কোনো ঢেউ তুলতে পারে না।
স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়ার এই শিক্ষাটি বর্তমানের অস্থির জীবনে মানসিক চাপ কমানোর এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর একটি দর্শন।


