হিন্দুধর্মে গরুকে শুধু একটি প্রাণী হিসেবে নয়, বরং 'গো-মাতা' বা জননীর সমতুল্য মনে করা হয়। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় — তিনটি গভীর কারণ রয়েছে:
১. মাতৃত্বের গুণ (দুগ্ধদান)
মানুষের জন্মের পর মায়ের বুকের দুধ যেমন শিশুর জীবন বাঁচায়, মা না থাকলে বা মায়ের বুকের দুধ পর্যাপ্ত না হলে গরুর দুধই সেই শিশুকে পুষ্টি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। শাস্ত্র ও সমাজ মনে করে, যেহেতু গরুর দুধ পান করে আমরা বড় হই, তাই সে আমাদের দ্বিতীয় মাতা। গরু নিঃস্বার্থভাবে নিজের সন্তানকে (বাছুর) বঞ্চিত করে মানুষকে দুধ দেয়, যা কেবল একজন মায়ের পক্ষেই সম্ভব।
২. সর্বদেবময়ী সত্তা
পুরাণ ও শাস্ত্রমতে, গরুর দেহের প্রতিটি অংশে বিভিন্ন দেব-দেবীর বাস।
গরুর শিং-এ ভগবান শিব ও ব্রহ্মা, কপালে বিষ্ণু এবং সর্বাঙ্গে ৩৩ কোটি দেব-দেবীর অধিষ্ঠান বলে বিশ্বাস করা হয়।
কামধেনু (স্বর্গের অলৌকিক গাভী) থেকে সব কিছুর উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। তাই গরুর সেবা করা মানে সমস্ত দেব-দেবীর সেবা করা।
৩. জীবন ও জীবিকার আধার (অর্থনৈতিক গুরুত্ব)
প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিপ্রধান সমাজে গরু ছিল অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
কৃষি: বলদ জমি চাষে সাহায্য করে।
জ্বালানি ও সার: গরুর গোবর ও মূত্র জমির উর্বরতা বাড়াতে এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পঞ্চগব্য: দুধ, দই, ঘি, গোবর ও গোমূত্র—এই পাঁচটি উপাদান (পঞ্চগব্য) আয়ুর্বেদ চিকিৎসা এবং ধর্মীয় পূজায় অপরিহার্য।
একজন মা যেমন ঘর আগলে রাখেন, গরুও তেমনি কৃষকের সংসার সমৃদ্ধিতে মা হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
৪. সাত্ত্বিক গুণ ও অহিংসা
গরু অত্যন্ত শান্ত ও নিরীহ প্রাণী। হিন্দু দর্শনে গরুকে অহিংসা এবং ধৈর্যের প্রতীক মনে করা হয়। ঋগ্বেদে গরুকে 'অঘ্ন্যা' বলা হয়েছে, যার অর্থ—'যাকে কখনও হত্যা করা উচিত নয়'। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং রাখাল বেশে গরুর সেবা করে দেখিয়েছেন যে, প্রাণীকুলের মধ্যে গাভী পরম শ্রদ্ধার যোগ্য।
গরু আমাদের জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছু দান করে কিন্তু বিনিময়ে খুব সামান্যই প্রত্যাশা করে। এই নিঃস্বার্থ ত্যাগের কারণেই তাকে মাতৃতুল্য সম্মান দিয়ে 'গো-মাতা' ডাকা হয়।


