দ্রৌপদীর পাঁচজন স্বামী গ্রহণের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয় —
একটি অনিচ্ছাকৃত আদেশ
একটি পূর্বজন্মের বর
এবং একটি দৈব পরিকল্পনা
১. মাতা কুন্তীর অনিচ্ছাকৃত আদেশ
মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রৌপদীকে জয় করার পর ভাইদের নিয়ে কুটিরে ফিরে আসেন। তাঁরা মজা করে মা কুন্তীকে বলেন, "মা, দেখো আজ আমরা কী এনেছি!" কুন্তী তখন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তাই না দেখেই উত্তর দেন—
"যা এনেছ, পাঁচ ভাই মিলে সমানভাবে ভাগ করে নাও।"
সেই যুগে মায়ের আদেশকে অলঙ্ঘনীয় মনে করা হতো। কুন্তী পরে বুঝতে পেরে ব্যথিত হলেও, তাঁর মুখ নিঃসৃত বাক্যকে সত্য প্রমাণ করতে পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদীকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নেন।
২. পূর্বজন্মের বর
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দ্রৌপদী তাঁর পূর্বজন্মে ঋষি মুদগলের পত্নী নালয়ানী ছিলেন। আবার অন্য মতে, তিনি এক তপস্বিনী ছিলেন যিনি শিবের আরাধনা করেছিলেন। তিনি শিবের কাছে বর চেয়েছিলেন এমন একজন স্বামী, যার মধ্যে এই পাঁচটি গুণ থাকবে —
ধর্মপরায়ণতা (যুধিষ্ঠির)
শক্তি ও গদাযুদ্ধ দক্ষতা (ভীম)
ধনুর্বিদ্যা ও বীরত্ব (অর্জুন)
রূপ ও সৌন্দর্য (নকুল)
ধৈর্য ও জ্ঞান (সহদেব)
একই মানুষের মধ্যে এই পাঁচটি বিরল গুণের সমাবেশ অসম্ভব হওয়ায়, শিব তাঁকে পরবর্তী জন্মে পাঁচজন স্বামীর বর দিয়েছিলেন।
৩. ঋষি ব্যাসদেবের ব্যাখ্যা
যখন রাজা দ্রুপদ (দ্রৌপদীর পিতা) এই অস্বাভাবিক বিবাহে আপত্তি জানিয়েছিলেন, তখন ঋষি ব্যাসদেব তাঁকে একটি দিব্যদৃষ্টি দান করেন। ব্যাসদেব ব্যাখ্যা করেন যে, পঞ্চপাণ্ডব আসলে পঞ্চ ইন্দ্রের অংশ এবং দ্রৌপদী স্বয়ং শচী বা স্বর্গলক্ষ্মীর অবতার। তাই পার্থিব দৃষ্টিতে এটি পাঁচজন স্বামী মনে হলেও, আধ্যাত্মিকভাবে তাঁরা এক অবিভাজ্য সত্তারই অংশ।
৪. পাণ্ডবদের একতা রক্ষা
যৌক্তিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে দেখলে, দ্রৌপদী অত্যন্ত সুন্দরী ও গুণবতী ছিলেন। অর্জুন তাঁকে জয় করলেও, পাণ্ডবদের মধ্যে যাতে তাঁকে নিয়ে কোনো অভ্যন্তরীণ বিবাদ বা ঈর্ষা তৈরি না হয় এবং তাঁদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট থাকে, সেই উদ্দেশ্যেও যুধিষ্ঠির সবাইকে একত্রে দ্রৌপদীকে পত্নী হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন।
এই সবকিছুর মূলে ছিল কুরুক্ষেত্রের আসন্ন যুদ্ধ এবং অধর্ম বিনাশের একটি বৃহত্তর দৈব পরিকল্পনা, যেখানে দ্রৌপদীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


