মহাভারতের কাহিনী অনুসারে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পিতামহ ভীষ্মের শরশয্যা গ্রহণের মূলে ছিল তাঁর অজেয় বীরত্ব, একটি প্রাচীন অভিশাপ এবং তাঁর নিজের নেওয়া কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত। এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো —
১. শিখণ্ডীর ভূমিকা
ভীষ্মের কাছে বর ছিল যে, তিনি নিজের ইচ্ছা ছাড়া মৃত্যুবরণ করবেন না (স্বচ্ছল মৃত্যু)। পাণ্ডবরা জানতেন যে ভীষ্মকে পরাজিত করা অসম্ভব। তখন শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে পাণ্ডবরা শিখণ্ডীকে যুদ্ধের সামনে নিয়ে আসেন। পূর্বজন্মে শিখণ্ডী ছিলেন অম্বা, যিনি ভীষ্মের কারণে স্বয়ম্বর সভায় লাঞ্ছিত হয়ে তাঁকে বিনাশ করার জন্য পুনর্জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি কোনো নারীর ওপর বা এমন কারোর ওপর অস্ত্র ধরবেন না, যিনি আগে নারী ছিলেন। শিখণ্ডীকে সামনে দেখে ভীষ্ম ধনুর্বাণ ত্যাগ করেন।
২. অর্জুনের বাণবর্ষণ
শিখণ্ডীকে সামনে রেখে অর্জুন ভীষ্মের বুক লক্ষ্য করে অজস্র বাণ নিক্ষেপ করেন। অর্জুনের তীক্ষ্ণ বাণে পিতামহ ভীষ্মের শরীর এমনভাবে বিদ্ধ হয়েছিল যে, তিনি যখন রথ থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর শরীর ভূমি স্পর্শ করেনি। তীরের ফলার ওপর তাঁর দেহটি আটকে যায় — এটিই ইতিহাসে 'শরশয্যা' নামে পরিচিত।
৩. উত্তরায়ণের প্রতীক্ষা
ভীষ্ম যখন শরশয্যায় শায়িত হন, তখন সূর্য দক্ষিণায়নে ছিল। শাস্ত্রমতে, দক্ষিণায়নে দেহত্যাগ করলে মোক্ষ লাভ হয় না। তাই ইচ্ছামৃত্যুর বর থাকায় ভীষ্ম স্থির করেন যে, তিনি তীরের ওপর শুয়েই উত্তরায়ণের জন্য অপেক্ষা করবেন। দীর্ঘ ৫৮ দিন সেই যন্ত্রণাদায়ক শয্যায় শুয়ে থেকে তিনি পাণ্ডবদের রাজধর্ম ও মোক্ষধর্মের উপদেশ দিয়েছিলেন এবং সূর্য উত্তরায়ণে প্রবেশ করলে দেহত্যাগ করেন।
৪. পূর্বজন্মের কর্মফল (বসুদের অভিশাপ)
পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভীষ্ম ছিলেন আট বসুর একজন (দ্যু নামক বসু)। বশিষ্ঠ মুনির কামধেনু চুরি করার অপরাধে বশিষ্ঠ তাঁদের অভিশাপ দিয়েছিলেন মর্ত্যে মানুষ হয়ে জন্ম নিতে। বাকি সাত জন দ্রুত মুক্তি পেলেও, মূল পরিকল্পনাকারী হওয়ার কারণে 'দ্যু' অর্থাৎ ভীষ্মকে দীর্ঘকাল মর্ত্যে দুঃখ ভোগ করার অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল। শরশয্যার এই দীর্ঘ কষ্ট ছিল সেই অভিশাপেরই অন্তিম পর্যায়।
ভীষ্মের এই শরশয্যা গ্রহণ ছিল একদিকে যেমন তাঁর বীরত্বের প্রতীক, অন্যদিকে তাঁর নীতি ও প্রতিজ্ঞার প্রতি অটল থাকার এক চরম নিদর্শন।


