হিন্দু ধর্মের প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ সৃষ্টি হয়েছে কেমন করে?
1 answers
3 views
Uzzwal Dhali
+1
Answer
Login
1 Answer

হিন্দু ধর্ম ও বৈদিক ঐতিহ্যের বিশ্বাস অনুযায়ী, ঋগ্বেদ কোনো সাধারণ মানুষের রচিত গ্রন্থ নয়, বরং এটি ‘অপৌরুষেয়’ (অর্থাৎ মানুষের দ্বারা সৃষ্ট নয়)। হিন্দু ধর্মের শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঋগ্বেদের সৃষ্টির ব্যাখ্যা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. অপৌরুষেয় ও শ্রুতি শাস্ত্র

হিন্দু ধর্মতত্ত্বে ঋগ্বেদকে ‘শ্রুতি’ বলা হয়। ‘শ্রুতি’ শব্দের অর্থ হলো যা ‘শোনা হয়েছে’। বিশ্বাস করা হয়, প্রাচীন ঋষিরা গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকাকালীন মহাজাগতিক সত্য ও মন্ত্রগুলো সরাসরি ঈশ্বর বা পরমাত্মার কাছ থেকে শ্রবণ করেছিলেন। তাই ঋগ্বেদ কোনো মানুষের নিজস্ব কল্পনাপ্রসূত রচনা নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের শাশ্বত জ্ঞান বা সত্যের প্রকাশ, যা ঋষিরা কেবল দর্শন ও শ্রবণ করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

২. ঋষিদের ভূমিকা (দ্রষ্টা হিসেবে)

ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলোকে ‘সৃষ্টি’ করা হয়েছে বলা হয় না, বরং বলা হয় ঋষিরা এই মন্ত্রগুলো ‘দর্শন’ করেছেন। এই কারণেই ঋষিদের ‘মন্ত্রদ্রষ্টা’ বলা হয়। ঋগ্বেদে অনেক ঋষির নাম পাওয়া যায়, তবে তারা এই মন্ত্রের রচয়িতা নন, বরং তারা এই মন্ত্রের আবিষ্কর্তা বা প্রচারক। যেমন—বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, ভৃগু, অঙ্গিরা প্রমুখ ঋষিরা ধ্যানের মাধ্যমে এই মন্ত্রগুলো উপলব্ধি করেছিলেন।

৩. ব্রহ্মার মুখ থেকে উদ্ভব

পৌরাণিক শাস্ত্র ও বিভিন্ন উপনিষদে সৃষ্টির বর্ণনায় বলা হয়েছে, সৃষ্টির শুরুতে প্রজাপতি ব্রহ্মা পরমাত্মার ধ্যানে রত ছিলেন। সেই ধ্যানের গভীরতা থেকে তাঁর মুখনিঃসৃত বাক্য হিসেবে চারটি বেদের আবির্ভাব ঘটে। ঋগ্বেদ হলো সেই আদি জ্ঞানভাণ্ডার যা সৃষ্টির রহস্য ও স্তুতির আধার।

৪. বংশপরম্পরায় সংরক্ষণ (মৌখিক ঐতিহ্য)

প্রাচীনকালে বেদ লিখিত ছিল না। এটি মূলত গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মৌখিকভাবে সংরক্ষিত হতো। ঋষিরা এই মন্ত্রগুলোকে কণ্ঠস্থ করে রাখতেন এবং সঠিক উচ্চারণ ও ছন্দের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করতেন। দীর্ঘকাল ধরে এই মৌখিক শ্রুতি ও স্মৃতির ওপর ভিত্তি করেই ঋগ্বেদ টিকে ছিল, যে কারণে এর উচ্চারণশৈলী ও ছন্দ আজও অত্যন্ত নির্ভুল ও সুশৃঙ্খল।

৫. ঋগ্বেদের স্বরূপ

ঋগ্বেদ মূলত বিভিন্ন দেব-দেবীর স্তুতি বা প্রার্থনার সংকলন। এতে ১০টি মণ্ডল (অধ্যায়) এবং ১০,৫৫০টিরও বেশি মন্ত্র রয়েছে। এটি সৃষ্টির নিয়ম, প্রাকৃতিক শক্তির (যেমন—অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ) মাহাত্ম্য এবং মানুষের জীবনদর্শনের এক অনন্য সংমিশ্রণ।

সারসংক্ষেপ: ধর্মীয় শাস্ত্র অনুযায়ী, ঋগ্বেদ সৃষ্টি হয়েছে পরমাত্মার থেকে উদ্ভূত মহাজাগতিক কম্পন বা জ্ঞানের মাধ্যমে, যা ঋষিরা ধ্যানের স্তরে শ্রবণের মাধ্যমে লাভ করেছিলেন। এটি কোনো লৌকিক ইতিহাস বা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ফসল নয়, বরং একে সনাতন সত্য বা আপ্তবাক্য হিসেবে গণ্য করা হয়।