সনাতন ধর্মে এই প্রশ্নটি খুবই সাধারণ এবং অত্যন্ত গভীর। এককথায় বলতে গেলে—তাত্ত্বিকভাবে সব দেবতা এক পরমেশ্বরেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও শক্তির প্রকাশ, তবে লীলা ও গুণের বিচারে তাঁদের মধ্যে পদমর্যাদা এবং দায়িত্বের পার্থক্য রয়েছে। ঋগ্বেদের একটি বিখ্যাত মন্ত্রে বলা হয়েছে:
"একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি" > অর্থাৎ: পরম সত্য বা ঈশ্বর এক, জ্ঞানীরা তাঁকে বহু নামে ডেকে থাকেন।
বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য বৈদিক দর্শনের আলোকে একে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে আলোচনা করা হলো:
১. মূল উৎস: এক পরমব্রহ্ম বা পরমেশ্বর
সনাতন ধর্মের সর্বোচ্চ সত্য হলো—ঈশ্বর মূলত এক। সেই নিরাকার ও সর্বব্যাপী পরম সত্তাকে বলা হয় 'ব্রহ্ম' বা 'পরমব্রহ্ম'। যখন সেই এক ঈশ্বরই সৃষ্টির বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করার জন্য রূপ ধারণ করেন, তখন তাঁদের আমরা বিভিন্ন 'দেবতা' নামে ডাকি।
যেমন—একজন মানুষই তাঁর সন্তানের কাছে 'বাবা', অফিসের কর্মচারীদের কাছে 'বসের', এবং বাবা-মায়ের কাছে 'সন্তান'। মানুষটি একজনই, কিন্তু সম্পর্কের খাতিরে তাঁর রূপ ও দায়িত্ব আলাদা। দেবতাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা একই রকম।
২. গুণ ও কাজের ভিত্তিতে ভিন্নতা (ত্রিমূর্তি)
পরমেশ্বরের প্রধান তিনটি গুণ বা শক্তিকে পরিচালনা করার জন্য তিনজন মূল দেবতা বা 'ত্রিমূর্তি'র প্রকাশ ঘটেছে:
ব্রহ্মা: সৃষ্টির দেবতা (রজোগুণ)।
বিষ্ণু: স্থিতিশীলতা বা পালনের দেবতা (সত্ত্বগুণ)।
শিব: ধ্বংস বা রূপান্তরের দেবতা (তমোগুণ)।
এই তিন মূল দেবতা আসলে এক পরমেশ্বরেরই তিনটি ভিন্ন রূপ, যা জগতের ভারসাম্য রক্ষা করে।
৩. প্রশাসনিক দায়িত্ব বা 'দেবতা' পদবী
বৈদিক শাস্ত্রে 'দেবতা' শব্দটির অর্থ যিনি 'দান করেন' বা 'যিনি ভাস্বর'। জগতের প্রাকৃতিক নিয়মগুলো সচল রাখার জন্য পরমেশ্বর কিছু পুণ্যবান জীবাত্মাকে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে নির্দিষ্ট দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। এঁরা হলেন 'দেবতা' (যেমন—ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু, বরুণ)।
অফিসের উদাহরণ: একটা দেশের সরকার যেমন একজনই (পরমেশ্বর), কিন্তু দেশ চালানোর জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী বা শিক্ষামন্ত্রী থাকেন—ঠিক তেমনি দেবতারা হলেন পরমেশ্বরের নিয়োগকৃত এক একজন 'মন্ত্রী'। সূর্যদেব আলো দেন, বরুণদেব জল দেন, পবনদেব বাতাস দেন। এই স্তরের দেবতারা কিন্তু পরমেশ্বর নন, তাঁরা ঈশ্বরের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মহাবিশ্বের একেকটি দপ্তর সামলান।
৪. অবতার ও ঈশ্বরের স্বাংশ
শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাম বা শ্রীবিষ্ণু এবং দেবী দুর্গা বা কালী—এঁরা প্রকৃতির নিয়ম বা কোনো দপ্তরের অধীন নন। এঁরা হলেন স্বয়ং পরমেশ্বরের বিভিন্ন দিব্য রূপ (অবতার বা স্বাংশ)। ভক্তের ভক্তি এবং প্রেমের রস আস্বাদন করার জন্য এক ঈশ্বরই রাম, কৃষ্ণ বা শিব রূপে লীলা করেন। তাত্ত্বিকভাবে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণুর সাথে শ্রীরামের কোনো তফাত নেই, কেবল রূপ ও লীলার প্রকাশ ভিন্ন।
৫. দেব-দেবী পুজো কেন করা হয়?
যেহেতু সব দেবতাই কোনো না কোনোভাবে সেই এক পরমেশ্বরের সাথে যুক্ত, তাই সাধারণ মানুষ নিজের রুচি, স্বভাব এবং মানসিকতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রূপের উপাসনা করে।
কেউ শান্ত রূপ পছন্দ করলে শিবের উপাসনা করেন, কেউ মধুর রসের জন্য কৃষ্ণের উপাসনা করেন, আবার কেউ শক্তির জন্য মা দুর্গার আরাধনা করেন। সনাতন ধর্ম মানুষকে এই স্বাধীনতা দেয়, কারণ নদী যে পথেই প্রবাহিত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা সাগরেই গিয়ে মেশে।
উপসংহার: তত্ত্বের বিচারে সূর্য যেমন একটিই, কিন্তু জানালার কাচ, নদীর জল বা আয়নার ওপর তার প্রতিফলনকে আলাদা মনে হয়—ঈশ্বরও ঠিক তেমনি এক। সব দেবতার মূল শক্তি সেই এক পরমেশ্বরই। তবে মহাবিশ্বের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা দেবতারা (যেমন ইন্দ্র বা অগ্নি) এবং স্বয়ং পরমেশ্বর (যেমন কৃষ্ণ বা বিষ্ণু)—একই উৎসের হলেও শক্তি ও মর্যাদার দিক থেকে এক নন।


