হিন্দু শাস্ত্র, বিশেষ করে শ্রীমদ্ভাগবত, বিষ্ণুপুরাণ এবং মহাভারত অনুযায়ী কলিযুগে মানুষের দুঃখ ও অশান্তির প্রধান কারণগুলোকে কয়েকটি মূল মানসিক ও সামাজিক ব্যাধির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সংক্ষেপে, কলিযুগে দুঃখের মূল কারণ হলো ধর্মের অধঃপতন, মানসিক অস্থিরতা এবং বস্তুগত চাহিদার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি।
প্রধান কারণগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. ধর্মের চার স্তম্ভের ক্ষয়
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ধর্মের চারটি প্রধান পা বা স্তম্ভ রয়েছে: সত্য (Satya), দয়া (Compassion), পবিত্রতা (Purity) এবং তপস্যা/আত্মসংযম (Austerity)। কলিযুগে এই চারটির তীব্র অবনতি ঘটে:
অসত্যের বিস্তার: মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়, যার ফলে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়।
দয়াহীনতা: মানুষের প্রতি মানুষের এবং অন্যান্য জীবজন্তুর প্রতি দয়া ও সহানুভূতির অভাব দেখা দেয়।
২. অহংকার ও লোভ (কাম ও ক্রোধ)
কলিযুগে মানুষ আধ্যাত্মিক উন্নতির চেয়ে কাম (অনিয়ন্ত্রিত ইচ্ছা), ক্রোধ, লোভ এবং অহংকার দ্বারা বেশি পরিচালিত হয়। বস্তুগত সম্পদ অর্জনকেই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি মনে করায় মানুষ কখনোই তৃপ্ত হতে পারে না, যা ক্রমাগত মানসিক অশান্তির জন্ম দেয়।
৩. সম্পর্কের কৃত্রিমতা ও ভাঙন
কলিযুগে সম্পর্কগুলো ভালোবাসা ও কর্তব্যের চেয়ে স্বার্থ এবং বাহ্যিক রূপের ওপর বেশি নির্ভর করে। পরিবার ও সমাজের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে একাকীত্ব এবং পারিবারিক অশান্তি বৃদ্ধি পায়।
৪. মনের অস্থিরতা ও অবিদ্যা (অজ্ঞানতা)
মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তা (আত্মা) সম্পর্কে সচেতন না হয়ে কেবল বাহ্যিক জগত ও শরীরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই অন্তর্মুখী সচেতনতার অভাবই মানুষকে ভেতরের বিষন্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক শান্তির অভাবের দিকে ঠেলে দেয়।
৫. অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
সংযমহীন আহার, নিদ্রা এবং জীবনযাত্রার কারণে মানুষ অকালেই শারীরিক ও মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।
সংক্ষেপে: কলিযুগে বাহ্যিক উপকরণের প্রাচুর্য থাকলেও আত্মসংযম, ভক্তি এবং বাহ্যিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যের অভাবই মানুষের দুঃখ ও অশান্তির মূল কারণ। শাস্ত্র অনুযায়ী, এই যুগে নাম জপ, আধ্যাত্মিক চর্চা এবং পারস্পরিক প্রেম-দিয়াই হলো শান্তির পথ।


