শ্রীমদ্ভাগবতম্ অনুযায়ী প্রকৃত ধর্ম হলো 'ভাগবত ধর্ম' বা ভগবান অধোক্ষজের (শ্রীকৃষ্ণের) প্রতি নিষ্কাম ও অহৈতুকী পরম ভক্তিভাব অর্জন করা।
শ্রীমদ্ভাগবতমে লৌকিক সামাজিক নিয়ম, স্বার্থসিদ্ধি বা স্বর্গসুখ লাভের জন্য সম্পাদিত সকাম ক্রিয়াকলাপকে "প্রকৃত ধর্ম" বলা হয়নি। বরং কপটতা বা স্বার্থহীন পরমভক্তিকেই এতে পরা ধর্ম বা শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. প্রকৃত ধর্মের সংজ্ঞা (পরা ধর্ম)
শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম স্কন্ধের ২য় অধ্যায়ের ৬ষ্ঠ শ্লোকে প্রকৃত বা পরা ধর্মের মূল লক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে:
স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো মতো ভক্তিরধোক্ষজে।
অহৈতুক্যপ্রতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি॥
(শ্রীমদ্ভাগবতম্ ১/২/৬)
অর্থ: মানুষের পরম বা প্রকৃত ধর্ম তিনিই, যার দ্বারা ইন্দ্রিয়াতীত পরমেশ্বরের (অধোক্ষজ) প্রতি ভক্তির উন্মেষ ঘটে। সেই ভক্তি হতে হবে অহৈতুকী (কোনো প্রকার জাগতিক স্বার্থ বা কারণহীন) এবং অপ্রতিহতা (কোনো জড়ীয় বাধা-বিপত্তি দ্বারা যা রুদ্ধ হয় না)। তবেই আত্মা সম্পূর্ণ প্রশান্তি ও তুষ্টি লাভ করে।
২. প্রকৃত ধর্মের প্রধান লক্ষণসমূহ
শ্রীমদ্ভাগবতম্ পর্যালোচনা করলে প্রকৃত ধর্মের প্রধান লক্ষণগুলো পাওয়া যায়:
১. অহৈতুকী (স্বার্থহীনতা)
প্রকৃত ধর্মে জাগতিক লাভ-ক্ষতি, কাম-বাসনা বা মুক্তির আশা থাকে না। ভক্ত কেবল ভগবানের আনন্দের জন্যই তাঁর সেবা করেন, নিজের আত্মসুখ বা ভোগের উদ্দেশ্যে নয়।
২. অপ্রতিহতা (অবিচ্ছিন্নতা)
দারিদ্র্য, ব্যাধি বা বৈরী পরিবেশ—কোনো জাগতিক বাধাই এই ধর্ম বা ভক্তি অনুষ্ঠান থেকে সাধককে বিচ্যুত করতে পারে না। এটি সকল অবস্থায় নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় থাকে।
৩. সর্বজনীনতা ও আত্মতুষ্টি
এই ধর্ম কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা বাহ্যিক পরিচয়ের সীমানায় আবদ্ধ নয়। মানুষ, জীব বা বিশ্বজগতের সর্বস্তরের সত্তা এই ধর্ম পালন করতে পারে এবং এটিই আত্মার প্রকৃত সন্তুষ্টি বিধান করে।
৪. প্রোজ্ঝিত-কৈতব (কপটতাহীনতা)
ভাগবতের অন্যতম প্রধান ঘোষণা হলো—স্বার্থপূর্ণ এবং ফলকামনাযুক্ত সমস্ত ছদ্ম-ধর্মকে (কৈতব ধর্ম) এখান থেকে সম্পূর্ণ দূর করা হয়েছে ("ধর্মঃ প্রোজ্ঝিত-কৈতবোঽত্র..." - ১/১/২)।
৩. আচরণগত ও নৈতিক লক্ষণসমূহ
শ্রীমদ্ভাগবতের ৭ম স্কন্ধের ১১শ অধ্যায়ে (শ্রীনারদ-যুধিষ্ঠির সংবাদ) মানবজাতির প্রকৃত ধর্মের ৩০টি সাধারণ লক্ষণের উল্লেখ রয়েছে। এগুলো হলো সততা, অহিংসা, দয়া, ইন্দ্রিয়সংযম, শৌচ (পবিত্রতা), সত্যবাদিতা, সরলতা ও ভগবানের গুণকীর্তন ইত্যাদি।
তাছাড়া ধর্মে ৪টি মূল স্তম্ভ বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়:
দয়া (জীবে কৃপা)
সত্য (সত্যনিষ্ঠা)
তপস্যা (ইন্দ্রিয় দমন ও সংযম)
শৌচ (মন ও শরীরের শুচিতা)
সংক্ষেপে: শ্রীমদ্ভাগবতম্ অনুসারে কেবল আনুষ্ঠানিক আচার-অনুষ্ঠান বা পুণ্য অর্জন প্রকৃত ধর্ম নয়; ভগবানের প্রতি অহৈতুকী, নিঃস্বার্থ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রেমপূর্ণ সেবাই হলো মানুষের প্রকৃত ধর্ম বা পরা ধর্ম।


