আমরা কেন এই জড় জগতে (সংসারে) এসেছি—এটি সনাতন ধর্মের সবচেয়ে গভীর এবং মৌলিক প্রশ্নগুলোর একটি। বৈদিক শাস্ত্র, বিশেষ করে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, উপনিষদ এবং ভক্তিশাস্ত্র অনুযায়ী, আমাদের এই জগতে আসার প্রধান কারণগুলোকে নিচে সহজ ও গোছানোভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. ঈশ্বরের থেকে স্বাধীনভাবে ভোগ করার ইচ্ছা (মূল কারণ)
আধ্যাত্মিক তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি জীবাত্মা মূলত ভগবানেরই অংশ (চিদংশ)। পরমধামে বা বৈকুণ্ঠে জীব ভগবানের সেবা করে পরম আনন্দ পায়। কিন্তু যখনই জীবের মনে ভগবানের মতো স্বাধীনভাবে নিজে 'ভোক্তা' বা 'মালিক' হওয়ার ইচ্ছা জাগে, তখনই সে আধ্যাত্মিক জগত থেকে এই জড় জগতে পতিত হয়।
সোজা কথায়, আমরা এই জড় জগতকে ভোগ করতে এবং নিজেদের মনের মতো করে আনন্দ পেতে এখানে এসেছি। এই জগতটি আসলে আমাদের সেই স্বাধীন ইচ্ছা পূরণের একটি রঙ্গমঞ্চ।
২. পূর্বকর্মের ফল বা কর্মবন্ধন
সনাতন ধর্মে 'কর্মবাদ' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। আমরা অতীতে (এই জন্মে বা পূর্বের বহু জন্মে) যে সমস্ত ভালো বা মন্দ কাজ করেছি, তার একটি নির্দিষ্ট ফল বা 'সংস্কার' তৈরি হয়।
সেই কর্মের ফল ভোগ করার জন্যই আমাদের বারবার এই জগতে জন্ম নিতে হয়।
যতক্ষণ না আমাদের সঞ্চিত কর্মফল সম্পূর্ণ শূন্য হচ্ছে, ততক্ষণ এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র চলতেই থাকে।
৩. আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং আত্মশুদ্ধি (একটি পাঠশালা)
শ্রীকৃষ্ণ গীতায় এই জগতকে বলেছেন "দুঃখালয়মশাশ্বতম্" (দুঃখের স্থান এবং অস্থায়ী)। এখানে এসে আমরা প্রতিনিয়ত সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি এবং রোগ-শোকের মুখোমুখি হই।
এই জগতটি আসলে একটি স্কুল বা পাঠশালার মতো। এখানকার দুঃখ-কষ্ট আমাদের শেখায় যে, জড় জগতের সুখ স্থায়ী নয়।
এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জীব ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে তার আসল পরিচয় এই নশ্বর শরীর নয়, সে আসলে নিত্য আত্মা। এই বোধদয় বা আত্মশুদ্ধির জন্যই আমাদের এখানে আসা।
৪. ভগবানের লীলার পুতলি হওয়া
বেদান্ত অনুযায়ী, ভগবান একলা ছিলেন, তাই তিনি বহু হওয়ার ইচ্ছা করলেন ("একোহং বহু স্যাম" )। তিনি তাঁর লীলা বা আনন্দের বিস্তার ঘটানোর জন্য আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আমরা এই জগতে এসেছি তাঁর বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি ও লীলার অংশ হতে।
তাহলে আমাদের আসল লক্ষ্য কী?
আমরা যে কারণেই আসি না কেন, এই জগতে আমাদের থাকার উদ্দেশ্য কেবল খাওয়া-দাওয়া আর বংশবৃদ্ধি করা নয় (কারণ এগুলো পশুপাখিরাও করে)। মানুষের জীবনের আসল উদ্দেশ্য হলো "অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা"—অর্থাৎ, "আমি কে? কেন আমি কষ্ট পাচ্ছি? এবং ঈশ্বরের সাথে আমার সম্পর্ক কী?" তা জানা।
সারকথা: আমরা এখানে এসেছি আমাদের অতৃপ্ত বাসনা পূরণ করতে এবং কর্মফল ভোগ করতে। তবে এই জগতের মূল উদ্দেশ্য হলো—ভুলগুলো শুধরে নিয়ে, আত্মজ্ঞান লাভ করে, পুনরায় ভগবানের চরণে ফিরে যাওয়া (মোক্ষ বা ভক্তি লাভ করা)। এটি একটি সুযোগ, যা কেবল মানব জন্মেই সম্ভব।


