কৃষ্ণকে কিভাবে অনুভব করা যায়?
1 answers
22 views
Answer
Login
1 Answer

সনাতন ধর্ম এবং ভক্তিশাস্ত্র (বিশেষ করে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত) অনুযায়ী, কৃষ্ণ কোনো দূরের কেউ নন—তিনি প্রতিটা জীবের হৃদয়ে 'পরমাত্মা' রূপে বিরাজ করছেন। তাঁকে চোখ দিয়ে দেখা যায় না, কিন্তু শুদ্ধ ভক্তি এবং অনুভূতির মাধ্যমে তাঁকে হৃদয়ে অনুভব করা যায়।

কৃষ্ণকে অনুভব করার ৫টি সহজ ও শাস্ত্রীয় উপায় নিচে গুছিয়ে দেওয়া হলো:

১. শ্রবণ ও কীর্তন (নামের মাধ্যমে অনুভব)

কলিযুগে ভগবানকে অনুভব করার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো তাঁর নাম জপ ও লীলা কথা শ্রবণ করা।

আপনি যখন একাগ্র চিত্তে "হরে কৃষ্ণ" মহামন্ত্র জপ করবেন এবং নিজের কান দিয়ে সেই ধ্বনি শুনবেন, তখন ধীরে ধীরে মনের চঞ্চলতা দূর হবে।

নামের স্পন্দনের মাধ্যমেই কৃষ্ণকে হৃদয়ে প্রথম অনুভব করা যায়, কারণ শাস্ত্রে বলা হয়েছে—"নাম ও নামী (কৃষ্ণ) অভিন্ন"

২. প্রকৃতি ও সৃষ্টির মাঝে কৃষ্ণকে খোঁজা (গীতার শিক্ষা)

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ৭ম অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন কীভাবে আমরা দৈনন্দিন জীবনে তাঁকে অনুভব করতে পারি:

"রসোঽহমপ্সু কৌন্তেয় প্রভাস্মি শশিসূর্যয়োঃ..." (৭.৮)

অর্থ: "হে কৌন্তেয়, আমি জলের রস (স্বাদ), আমি সূর্য ও চন্দ্রের আলো, আমি সমস্ত বেদের প্রণব (ওঁ), আকাশে শব্দ এবং মানুষের মধ্যে পুরুষকার।"

তৃষ্ণার্ত অবস্থায় এক গ্লাস জল খাওয়ার সময় যে তৃপ্তি পান, ভাবুন সেটাই কৃষ্ণ।সকালে সূর্যের আলো যখন আপনার গায়ে পড়ে, অনুভব করুন ওটা কৃষ্ণেরই শক্তি।কোনো ফুল বা প্রকৃতির সুন্দর রূপ দেখে কৃষ্ণের শৈল্পিক মহিমা অনুভব করার চেষ্টা করুন।

৩. সমস্ত জীবের মধ্যে কৃষ্ণের উপস্থিতি দেখা

গীতা অনুযায়ী, কৃষ্ণ প্রতিটি প্রাণীর হৃদয়ে বসে আছেন। তাই যখন আপনি কোনো মানুষ, পশুপাখি বা গাছপালাকে কষ্ট না দিয়ে তাদের প্রতি দয়া ও সেবাভাব দেখাবেন, তখন আপনার অন্তরে এক পরম শান্তি আসবে। এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই কৃষ্ণকে অনুভব করার অন্যতম পথ। কৃষ্ণ বলেছেন: "যিনি সর্বভূতে আমাকে দেখেন এবং আমাতে সর্বভূত দেখেন, আমি কখনই তাঁর অদৃশ্য হই না।"

৪. প্রতিটি ঘটনাকে কৃষ্ণের ইচ্ছা বা কৃপা মনে করা

আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে—তা ভালো হোক বা খারাপ—সবকিছুর পেছনেই ভগবানের কোনো না কোনো পরিকল্পনা থাকে।

যখন কোনো বিপদে বা কষ্টে পড়বেন, তখন ভেঙে না পড়ে ভাবুন, "কৃষ্ণ আমাকে ধৈর্য শেখাচ্ছেন এবং আমার কর্মফল ক্ষয় করছেন।" * আবার যখন কোনো আনন্দ বা সাফল্য পাবেন, তখন অহংকার না করে ভাবুন, "এটি কৃষ্ণেরই পরম কৃপা।" এই ধরণের মানসিকতা (শরণাগতি) তৈরি হলে জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে কৃষ্ণের হাত অনুভব করা যায়।

৫. পঞ্চরসের যেকোনো একটিতে সম্পর্ক স্থাপন (ভাবের মাধ্যমে)

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন অনুযায়ী, কৃষ্ণকে কোনো দূরবর্তী ঈশ্বর না ভেবে নিজের খুব কাছের কেউ ভাবলে তাঁকে দ্রুত অনুভব করা যায়। আপনি আপনার মনের ভাব অনুযায়ী কৃষ্ণের সাথে ৫টি সম্পর্কের যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন:

  • শান্ত ভাব: তাঁকে পরমেশ্বর মেনে শান্তভাবে তাঁর ধ্যান করা।

  • দাস্য ভাব: নিজেকে তাঁর সেবক বা দাস মনে করা (যেমন হনুমানজি)।

  • সখ্য ভাব: কৃষ্ণকে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু বা সখা ভাবা (যেমন অর্জুন বা সুদামা)।

  • বাৎসল্য ভাব: কৃষ্ণকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসা ও যত্ন নেওয়া (যেমন মাতা যশোদা)।

  • মাধুর্য ভাব: কৃষ্ণকে নিজের পরম প্রিয় বা স্বামী রূপে ভালোবাসা (যেমন রাধারাণী বা মীরাবাঈ)।

সারকথা:

কৃষ্ণকে অনুভব করতে কোনো কঠিন বনের সাধনার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটু ব্যাকুলতা। যেমনটি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলতেন—"মানুষ তো সোনা-দানা বা সংসারের জন্য ঘটি ঘটি কাঁদে, কিন্তু ভগবানের জন্য কে কাঁদে? ভগবানের জন্য ব্যাকুল হয়ে কাঁদলে তাঁকে নিশ্চয়ই পাওয়া যায়।" আপনি যখনই আপনার সরল মন নিয়ে কৃষ্ণকে ডাকবেন, তখনই বুঝতে পারবেন তিনি আপনার ঠিক পাশেই আছেন।