হিন্দু মহাকাব্য মহাভারত অনুযায়ী পরম সত্যবাদী ও 'ধর্মরাজ' হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও যুধিষ্ঠিরকে মৃত্যুর পর ক্ষণিকের জন্য নরক দর্শন করতে হয়েছিল।
তবে তিনি চিরকালের জন্য নরকে যাননি; এটি ছিল অত্যন্ত অল্প সময়ের একটি অভিজ্ঞতা। এর পেছনে মূল পৌরাণিক কারণ এবং দৃষ্টিভঙ্গিগুলো নিচে দেওয়া হলো —
১. মূল কারণ: 'অশ্বত্থামা হতো ইতি গজ' (অর্ধসত্য বলা) কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পঞ্চদশ দিনে কৌরব সেনাপতি দ্রোণাচার্যকে পরাস্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। তখন শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে দ্রোণাচার্যের পুত্র 'অশ্বত্থামা' নামের একটি হাতিকে বধ করা হয়। দ্রোণাচার্যকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্য খবর রটানো হয় যে "অশ্বত্থামা মারা গেছে"। সত্যনিষ্ঠ দ্রোণাচার্য এটি বিশ্বাস করতে চাননি, তাই তিনি সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের কাছে বিষয়টি জানতে চান। যুধিষ্ঠির তখন উচ্চস্বরে বলেন —
অশ্বত্থামা হতো...
অর্থাৎ, অশ্বত্থামা নিহত হয়েছে
এবং তারপরেই অত্যন্ত মৃদু ও অস্পষ্ট স্বরে যোগ করেন —
...ইতি গজঃ
অর্থাৎ, একটি হাতি।
যুধিষ্ঠির জীবনে কখনো মিথ্যা বলেননি। কিন্তু যুদ্ধের জয়ের তাগিদে তিনি যে এই 'অর্ধসত্য' বা কৌশলী ছলনার আশ্রয় নিয়ে গুরু দ্রোণাচার্যকে বিভ্রান্ত করেছিলেন, শাস্ত্রমতে তা মিথ্যারই নামান্তর এবং পাপ হিসেবে গণ্য হয়েছিল।
২. রথের চাকা মাটিতে স্পর্শ করা মহাভারতে বর্ণিত আছে, যুধিষ্ঠির এতটাই নিষ্পাপ ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন যে তাঁর রথ সবসময় মাটি থেকে চার আঙুল ওপরে শূন্যে ভেসে থাকত। কিন্তু দ্রোণাচার্যের সাথে এই অর্ধসত্য বলার সাথে সাথেই তাঁর রথের চাকা মাটি স্পর্শ করে। অর্থাৎ, তাঁর নিখুঁত সত্যবাদিতায় প্রথম দাগ পড়ে।
৩. নরক দর্শনের ঘটনা মহাভারতের 'স্বর্গারোহণ পর্বে' বর্ণিত আছে, জীবনের শেষে পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী যখন মহাপ্রস্থানের পথে হিমালয়ের দিকে যাত্রা করেন, তখন একে একে দ্রৌপদী ও অন্য চার ভাই পতনপ্রাপ্ত হন। কেবল যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে পৌঁছান।
স্বর্গে পৌঁছে তিনি তাঁর ভাইদের এবং দ্রৌপদীকে দেখতে পান না, বরং কৌরবদের স্বর্গে অবস্থান করতে দেখেন। এতে তিনি বিস্মিত হয়ে ভাইদের খোঁজ করেন। তখন দেবতারা তাঁকে নরকের পথ ধরে নিয়ে যান।
— নরকের প্রচণ্ড দুর্গন্ধ, অন্ধকার ও যন্ত্রণাদায়ক পরিবেশ দেখে যুধিষ্ঠির ব্যথিত হন।
— সেখান থেকে তিনি তাঁর ভাইদের ও দ্রৌপদীর আর্তনাদ শুনতে পান। তারা যুধিষ্ঠিরকে সেখানে কিছুক্ষণ থাকার অনুরোধ জানান, কারণ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের উপস্থিতিতে তাঁদের নরকযন্ত্রণা লাঘব হচ্ছিল।
— তখন যুধিষ্ঠির স্বর্গে ফিরে যেতে অস্বীকার করেন এবং ভাইদের সাথে নরকেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
৪. নরক দর্শনের প্রকৃত রহস্য যুধিষ্ঠির নরকে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই সমস্ত অন্ধকার ও নরকের দৃশ্য মিলিয়ে যায়। তখন ইন্দ্র ও ধর্মদেব (যিনি ছদ্মবেশে ছিলেন) প্রকাশ হয়ে জানান যে, এটি মূলত দুটি কারণে ঘটেছিল:
ক. পাপের প্রায়শ্চিত্ত: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে গুরু দ্রোণাচার্যকে অর্ধসত্য বলে বিভ্রান্ত করার যে সামান্য পাপ তিনি করেছিলেন, তার ফল হিসেবেই তাঁকে এই ক্ষণিক নরকযন্ত্রণা ও দৃশ্য দেখতে হয়েছিল।
খ. চূড়ান্ত পরীক্ষা: এটি ছিল যুধিষ্ঠিরের ধৈর্য, ভাইদের প্রতি ভালোবাসা এবং ধর্মের প্রতি নিষ্ঠার শেষ পরীক্ষা। তিনি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর যুধিষ্ঠিরকে দেবনদী গঙ্গায় স্নান করানো হয় এবং তিনি তাঁর মর্ত্যের শরীর ত্যাগ করে পরম শান্তিময় অক্ষয় স্বর্গে প্রবেশ করেন।
পরম সত্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে গুরুকে বিভ্রান্ত করার জন্য বলা সামান্য 'অর্ধসত্য' - এর প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেই যুধিষ্ঠিরকে ক্ষণিকের জন্য নরক দর্শন করতে হয়েছিল।


