সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, দেবী দুর্গা কেবল অশুভ শক্তির বিনাশক মহিষাসুরমর্দিনী শক্তি রূপেই মর্ত্যে আসেন না, তিনি একজন স্নেহময়ী মা হিসেবেও ধরা দেন। দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনকে মূলত তাঁর বাপের বাড়িতে বাৎসরিক সফরের সাথে তুলনা করা হয়। তাঁর সন্তানদের (লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ) সাথে আসার পেছনে পৌরাণিক, সামাজিক ও দার্শনিক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে:
১. মাতৃত্ব ও পারিবারিক মিলন (সামাজিক দৃষ্টিকোণ)
পৌরাণিক রূপক অনুযায়ী, দেবী দুর্গার স্বামীর ঘর কৈলাসে (হিমালয়ে) এবং তাঁর বাপের বাড়ি মর্ত্যধামে (পৃথিবীতে)। প্রতি বছর শরৎকালে তিনি সন্তান-সন্ততি নিয়ে বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। সনাতন বাঙালি সংস্কৃতিতে দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি পারিবারিক মিলনোৎসব। মা যেমন সন্তানদের ছেড়ে একা কোথাও যান না, দেবী দুর্গাও তাঁর চার সন্তানকে নিয়ে মর্ত্যধামে আসেন।
২. জীবন ও মানবসমাজের প্রয়োজনীয় ৪টি উপাদানের প্রতীক
দেবী দুর্গার চার সন্তান মানব জীবনের চার ধরণের মৌলিক প্রয়োজন ও কল্যাণ নির্দেশ করে। মা দুর্গার সাথে তাঁরা এসে পৃথিবীতে পূর্ণতা ও ভারসাম্য সৃষ্টি করেন:
গণেশ (সিদ্ধি ও শুভ সূচনা): শুভ কাজ, জ্ঞান এবং সমস্ত বাধা দূর করার প্রতীক।
কার্তিক (বীরত্ব ও সুরক্ষা): শক্তি, সাহসিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের রূপক।
লক্ষ্মী (সম্পদ ও সমৃদ্ধি): অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শান্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক।
সরস্বতী (জ্ঞান ও সংস্কৃতি): বিদ্যা, জ্ঞান, শিল্প ও মেধার দেবতা।
মা দুর্গার সাথে এই চার দেব-দেবী আসার অর্থ হলো—পৃথিবীতে যেন শক্তির সাথে সাথে জ্ঞান, সাফল্য, সমৃদ্ধি এবং বীরত্বের আগমন ঘটে।
৩. ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ (পুরুষার্থের প্রতীক)
হিন্দু দর্শনে মানবজীবনের প্রধান চার লক্ষ্যকে 'চতুর্বর্গ' বা চার পুরুষার্থ বলা হয়। চার সন্তান মূলত এই চার লক্ষ্যের প্রতীকী রূপ:
গণেশ: ধর্ম (ন্যায্যতা ও কর্তব্য)
লক্ষ্মী: অর্থ (সম্পদ ও জীবিকা)
কার্তিক: কাম (কামনা, সুরক্ষা ও আনন্দ)
সরস্বতী: মোক্ষ (জ্ঞান ও মুক্তি)
মহামায়া মা দুর্গা যখন মর্ত্যে অবতীর্ণ হন, তখন তিনি মানবসমাজকে সর্বাত্মকভাবে সুখী ও স্বাবলম্বী করার জন্য তাঁর সন্তানদের মাধ্যমে এই চার পুরুষার্থের আশীর্বাদ সাথে নিয়ে আসেন।


