সনাতন ধর্ম এবং উপনিষদের দর্শন অনুযায়ী, জীবের মৃত্যু মানে অস্তিত্বের বিলোপ নয়, বরং এটি একটি পোশাক পরিবর্তনের মতো। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন— "বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহার..." অর্থাৎ, মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমনি জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীর ধারণ করে।
মৃত্যুর পর জীবের গতি মূলত তার কর্মফল (Karma) এবং চেতনার (Consciousness) ওপর নির্ভর করে। একে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়:
১. পুনর্জন্ম (Reincarnation)
অধিকাংশ সাধারণ জীবের ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম ঘটে। মৃত্যুর সময় একজন ব্যক্তির মনের অবস্থা বা চিন্তা যেমন থাকে, সে অনুযায়ী সে পরবর্তী শরীর লাভ করে।
যদি কেউ সারাজীবন পশুতুল্য আচরণ করে, তবে সে নিম্নতর যোনিতে (পশু-পাখি-পতঙ্গ) জন্ম নিতে পারে।
যদি কেউ পুণ্যকর্ম করে, তবে সে পুনরায় উচ্চবংশীয় বা উন্নত মানুষ হিসেবে জন্ম নেয়।
২. ঊর্ধ্বলোক বা স্বর্গ ও নিম্নলোক বা নরক
বেদে ও পুরাণে বিভিন্ন লোকের বর্ণনা আছে।
স্বর্গলোক: যারা প্রচুর পুণ্যকর্ম করেন, তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বর্গলোকে গিয়ে দেবভোগ উপভোগ করেন। কিন্তু পুণ্য শেষ হলে তাদের আবার মর্ত্যে (পৃথিবীতে) ফিরে আসতে হয়।
নরক: যারা ঘোরতর অধর্ম বা পাপকর্মে লিপ্ত থাকেন, তাদের শুদ্ধিকরণের জন্য নির্দিষ্ট নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। এটিও স্থায়ী নয়; শাস্তির মেয়াদ শেষ হলে তারা পুনরায় কর্মফল অনুযায়ী জন্ম নেয়।
৩. মোক্ষ বা মুক্তি (Liberation)
এটিই জীবনের পরম লক্ষ্য। যখন কোনো জীব ভগবানের ভক্তিতে নিমগ্ন হয় বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে, তখন তার কর্মের সমস্ত বন্ধন কেটে যায়। তাকে আর এই জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ফিরে আসতে হয় না।
সে পরমাত্মার সঙ্গে লীন হয় অথবা বৈকুণ্ঠের মতো চিন্ময় লোকে স্থান পায়।
মৃত্যুর পরবর্তী যাত্রার স্তর (The Journey After Death)
শাস্ত্র অনুসারে, মৃত্যুর পর সূক্ষ্ম শরীর (মন, বুদ্ধি ও অহংকার) স্থূল শরীর ত্যাগ করে। এই যাত্রার পথটি ব্যক্তির চেতনার ওপর ভিত্তি করে দুটি ভাগে বিভক্ত:
অৰ্চিরাদি মার্গ (আলোকিত পথ): যারা উচ্চতর আধ্যাত্মিক সাধনা করেন, তারা এই পথে ব্রহ্মলোকে যান, যেখান থেকে আর ফিরে আসতে হয় না।
ধূমাদি মার্গ (অন্ধকার পথ): যারা কেবল জাগতিক কামনা নিয়ে পুণ্য করেন, তারা এই পথে চন্দ্রলোকে যান এবং ভোগ শেষে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসেন।
মৃত্যুর সময়ের চেতনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গীতার ৮ম অধ্যায়ের ৬ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে— "যং যং বাপি স্মরণ্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্..." অর্থাৎ, মৃত্যুর সময় মানুষ যা স্মরণ করে, সে সেই ভাবটিই প্রাপ্ত হয়। এই কারণেই শাস্ত্রে সবসময় 'নাম-স্মরণ' করার উপদেশ দেওয়া হয়, যেন জীবনের শেষ মুহূর্তে ভগবানের চিন্তা থাকে এবং জীব উত্তম গতি লাভ করতে পারে।
মৃত্যুর পর আমাদের গতি হবে আমাদেরই সারাজীবনের সঞ্চিত কর্ম এবং চিন্তার প্রতিফলন। আমরা যা বপন করি, মৃত্যুর পর সেটিই কাটি।


