ভগবদগীতায় ২ অধ্যায়ের ৫৬ নং শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন -
দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে ।।
অনুবাদঃ ত্রিতাপ দুঃখ উপস্থিত হলেও যাঁর মন উদ্বিগ্ন হয় না, সুখ উপস্থিত হলেও যাঁর স্পৃহা হয় না এবং যিনি আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত, তিনিই স্থিতধী, অর্থাৎ স্থিতপ্রজ্ঞ।
স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির সাতটি বিশেষ লক্ষণ —
১. যে কোনও পরিস্থিতিতে অবিচল স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি আনন্দ বা দুঃখ—দুই অবস্থাতেই সাম্যভাব বজায় রাখেন। তিনি জড় জগতের উত্থানপতনে বিচলিত হন না। প্রিয় বস্তু লাভেও আনন্দে গর্বিত হন না, আবার অপ্রিয় বা কষ্টকর পরিস্থিতিতেও মর্মাহত হন না।
২. ইন্দ্রিয়ের অধীন নন তিনি ইন্দ্রিয়সুখের দাস নন, বরং তাঁর ইচ্ছাশক্তি ও আত্মানুশাসনের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলি নিয়ন্ত্রিত থাকে। ভোগে নয়, তিনি অবস্থান করেন আত্মবোধে।
৩. মনের স্থিরতা ও আত্মসংযম স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি নিজের মনকে বশে রাখেন। তিনি মোহ, মায়া বা অস্থির আকাঙ্ক্ষার দ্বারা চালিত নন। তাঁর চেতনা থাকে কৃষ্ণে নিবিষ্ট।
৪. সমদৃষ্টি সম্পন্ন তিনি সকলের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ধনী-দরিদ্র, পণ্ডিত-মূর্খ, গরু-কুকুর – সকলের মধ্যেই ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করে শ্রদ্ধা দেখান।
৫. কোনো কিছুর প্রতি অধিকারবোধ নেই স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি নিজেকে কিছুতেই মালিক মনে করেন না। তিনি জানেন সবই পরমেশ্বরের সম্পত্তি এবং তিনিই ভগবানের দাস। তাই তিনি সংযমী, কৃতজ্ঞ ও নিরাসক্ত।
৬. প্রকৃতির জীবের প্রতি দয়া তিনি প্রতিটি জীবকে ভগবানের অংশ বলে মনে করেন এবং তাই কোনো বিদ্বেষ নয়, বরং মমতা, করুণা ও সদ্ভাব নিয়ে আচরণ করেন।
৭. কর্মফল প্রত্যাশী নন তিনি নিষ্কাম কর্মযোগে বিশ্বাসী। কর্ম করেন, কিন্তু তার ফলাফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন না। ঈশ্বরের সেবাই তাঁর উদ্দেশ্য।
পরিশেষে বলা যায়, স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে একজন আত্মজ্ঞ, যিনি কৃষ্ণভাবনায় স্থির এবং কর্ম ও সংযমে প্রতিষ্ঠিত। তিনি সংসারধর্ম পালন করেও কৃষ্ণচেতনায় লীন থাকেন, তাই তিনিই গীতার আদর্শ চরিত্র।


