হিন্দু শাস্ত্রমতে মৃত্যুকে জয় করা যায় — এটি কেবল দেহের মৃত্যুকে অতিক্রম করাই নয়, বরং জন্ম-মৃত্যুর চক্র (সাংসারিক বন্ধন) থেকে মুক্তি পাওয়াকেই প্রকৃত অর্থে "মৃত্যু জয়" বলা হয়। এই মুক্তিকে বলা হয় মোক্ষ বা মুক্তি।
মৃত্যুকে জয় করার উপায় – শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাঃ
১. ভগবদ্ভক্তি ও নামসংকীর্তন
ভগবত গীতা ৮ম অধ্যায় ৫ নং শ্লোকে বলা হয়েছে —
"অন্তকালে চ মামেব স্মরণমুক্ত্বা কলেবরম্।
যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ॥"
👉 যার জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ভগবানের স্মরণ থাকে, সে পুনর্জন্ম না নিয়ে ভগবানের ধামে পৌঁছায়।
উপায়: সর্বদা হরিনাম সংকীর্তন — "হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে" — এর মাধ্যমে চেতনা শুদ্ধ হয় ও মৃত্যু জয় সম্ভব হয়।
২. গুরু ও শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসরণ
শ্রদ্ধাভক্তি সহকারে গুরু এবং বৈদিক শাস্ত্রানুসারী জীবন একজনকে ধীরে ধীরে জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্ত করে এবং আত্মজ্ঞান লাভে সহায়তা করে।
ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে —
"আচার্যবান্ পুরুষো বেদ" — যার গুরু আছে, সেই প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারে।
৩. কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগযারা নিষ্কাম কর্ম করে (ফল না চেয়ে), এবং আত্মাকে শরীর থেকে পৃথকভাবে উপলব্ধি করে, তারা জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়।
ভগবদ গীতা ২য় অধ্যায় ১৩ নং শ্লোকে বলা হয়েছে —
"যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ ধীরস্তত্র ন মূহ্যতি॥"
👉 আত্মা দেহ পরিবর্তন করে ঠিক যেমন শিশুকাল, যৌবন, বার্ধক্য আসে।এটি বোঝা মানেই মৃত্যু ভয়ের উপর বিজয়।
৪. শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ ও শ্রবণ
শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ ও শ্রবণ হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে ও ঈশ্বরের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায়। পারীক্ষিত মহারাজ মৃত্যুর সাত দিন আগে শ্রীশুকদেবের মুখে ভাগবত শ্রবণ করে মুক্তি লাভ করেন — এটাই ভক্তিযোগে মৃত্যুকে জয় করার চরম উদাহরণ।
মৃত্যুকে জয় করতে হলে জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভগবানকেন্দ্রিক, অহং ত্যাগ করে ভক্তি, জ্ঞান, এবং শাস্ত্রাচারের পথে অগ্রসর হওয়া।
তবে সবচেয়ে সহজ ও ফলপ্রসূ উপায় হলো — নামসংকীর্তনের মাধ্যমে ভগবানের শরণ নেওয়া।
এ প্রসঙ্গে প্রভুপাদ বলেছেনঃ
“মৃত্যু ভয়ের কারণ, কিন্তু কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করলে মৃত্যু আর ভয়ঙ্কর নয় — বরং মুক্তির দ্বার।”


