সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টিকারী পরমেশ্বর ভগবানকে কে সৃষ্টি করেছেন?
3 answers
158 views
ঋষভ
Eva Dhali
Uzzwal Dhali
+3
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

3 Answers
Not verified
July 30, 2025

ভগবান সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তাহলে ভগবানকে কে সৃষ্টি করলেন?"

এই প্রশ্নের উত্তর সনাতন ধর্ম এবং বিশেষ করে ভাগবত দর্শন (Bhāgavata philosophy)-এর ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করলে স্পষ্ট হয়।

---

🌼 মূল ধারণা: ভগবান অসৃষ্ট (ajā), অনাদি (beginningless)

ভগবানকে কেউ সৃষ্টি করেননি, কারণ ভগবান হচ্ছেন সর্বশেষ কারণ (sarva-kāraṇa-kāraṇam) — সমস্ত সৃষ্টির কারণ, কিন্তু নিজে কোনো কিছুর ফলাফল বা সৃষ্টি নন।

---

📖 শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা:

১. ব্রহ্ম সংহিতা (৫.১):

> īśvaraḥ paramaḥ kṛṣṇaḥ

sac-cid-ānanda-vigrahaḥ

anādir ādir govindaḥ

sarva-kāraṇa-kāraṇam

অর্থ:

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম ঈশ্বর। তাঁর রূপ চিরসত্য, চেতন ও আনন্দময়। তিনি অনাদি (কারো দ্বারা সৃষ্টি হননি), তবুও সমস্ত কিছুর আদিকারণ।

---

২. ভগবদ্ গীতা (১০.৮):

> ahaṁ sarvasya prabhavo

mattaḥ sarvaṁ pravartate

অর্থ:

আমি সবকিছুর উৎস, সব কিছু আমার থেকেই উদ্ভূত।

---

🧠 দর্শনচিন্তা:

কারণ ও কার্য (Cause and Effect) — জগতে যা কিছু সৃষ্টি হয়, তার একটি কারণ থাকে।

কিন্তু যদি সব কিছুর পেছনে একটি "শেষ কারণ" খুঁজতে যাই, তাহলে তা কখনোই শেষ হবে না যদি না আমরা একটি "অকারণ কারণ" (uncaused cause) মেনে নিই।

ভগবানই সেই চূড়ান্ত, অকারণ কারণ।

---

🔥 উদাহরণ:

সূর্য আলো দেয় — আমরা জিজ্ঞাসা করতে পারি, "সূর্য কোথা থেকে আলো পেল?"

কিন্তু একসময় এসে আমাদের মানতেই হবে, সূর্য নিজেই এক "আলোক উৎস"।

ঠিক তেমন, ভগবান নিজেই একমাত্র "সত্তার উৎস", যিনি কারো দ্বারা সৃষ্ট নন।

---

✅ সংক্ষেপে:

ভগবান অনাদি ও অসৃষ্ট।

তিনি চিরন্তন, সব সৃষ্টির উৎস, কিন্তু নিজে সৃষ্টি নন।

আমাদের সীমিত বুদ্ধিতে

সব কিছু কারণ-কার্য হিসেবে ভাবি, কিন্তু ঈশ্বর সেই সীমা অতিক্রম করেন।

ঋষভ
+1

"ভগবানকে কে সৃষ্টি করেছেন?" — এই প্রশ্নটি হাজার বছর ধরে দর্শন, ধর্ম ও যুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে সনাতন তথা হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী এবং বিশেষত ভগবদ্গীতা ও বৈষ্ণব দর্শনে, এই প্রশ্নের উত্তর খুবই পরিষ্কার।

🕉️ ভগবান অনাদি — তাঁকে কেউ সৃষ্টি করেননি

গীতায় বলা হয়েছে —

"অজো নিত্যঃ শাশ্বতো'য়ং পুরাণঃ"
— ভগবদ্গীতা ২য় অধ্যায় ২০ নং শ্লোক

অনুবাদঃ আত্মা যেমন জন্ম-জয়ী, তেমনি ভগবানও অনাদি, অনন্ত ও পুরাতন, কিন্তু চিরনবীন। তিনি কখনো জন্মগ্রহণ করেন না, কারণ তিনি স্বয়ম্ভূ।

🔱 ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেন —

"মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়"
ভগবদ্গীতা ৭ম অধ্যায় ৭ নং শ্লোক

অনুবাদঃ হে অর্জুন! আমার ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই। আমি সর্বোচ্চ তত্ত্ব।

🪷 ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছেঃ

"ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।
অনাদিরাদির্ গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্॥"

— ব্রহ্মসংহিতা ৫.১

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সকল কারণের কারণ, তিনি চিরন্তন, তাঁকে কেউ সৃষ্টি করেননি। তাঁর আকার চেতনাময়, চিরসত্তা ও আনন্দময়।

🧠 যুক্তির দৃষ্টিতেঃ

"যিনি সব সৃষ্টি করেছেন, যদি তাকেও কেউ সৃষ্টি করে থাকেন — তবে তিনিই আসল স্রষ্টা হতেন।"
কিন্তু এইভাবে পেছনে যেতে থাকলে আমরা একটি "first cause" খুঁজতে থাকি — এবং দর্শনে একে বলে "Prime Mover" বা "আদিকারণ", যাঁর দ্বারা সব সৃষ্টি, কিন্তু যিনি নিজে অসৃষ্ট।

সেই আদিকারণই পরমেশ্বর — যাঁর কোন সূচনা নেই। সনাতন ধর্ম তাঁকেই বলে "অনাদিরাদিঃ"

✨ উপসংহার:

ভগবানকে কেউ সৃষ্টি করেননি।
তিনি নিজেই সনাতন, চিরন্তন, সৃষ্টির উর্ধ্বে।
তিনিই সবকিছুর মূল কারণ — কিন্তু তাঁর কোনো কারণ নেই।

আগের প্রশ্নটি—

সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টিকারী পরমেশ্বর ভগবানকে কে সৃষ্টি করেছেন?
— প্রকৃতপক্ষে একটি loaded question-এর একেবারে classical উদাহরণ।

চলো তাহলে বিস্তারিতভাবে বোঝা যাক।


🔍 Loaded Question Fallacy কী?

Loaded question বা প্রতারণামূলক প্রশ্ন (প্রশ্নগত কূটচাল) হলো এমন একটি প্রশ্ন,
যেটি এক বা একাধিক অনিরূপিত (unproven) বা বিতর্কিত অনুমান ধরে নেয়,
এবং সেগুলোর উত্তর না দিয়েই মূল প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করে ফেলে।
এই কারণে প্রশ্নটি উত্তরদাতার জন্য “ফাঁদ” হয়ে দাঁড়ায়।


📌 Loaded Question-এর উদাহরণ:

১. “তুমি এখনও তোমার শিক্ষককে ঠকাও?”
👉 এই প্রশ্নে ধরে নেওয়া হয়েছে যে, তুমি একসময় শিক্ষককে ঠকিয়েছিলে — অথচ সেটা তো এখনো প্রমাণ হয়নি!

২. “ভগবানকে কে সৃষ্টি করেছে?”
👉 এই প্রশ্নটি ধরে নিচ্ছে যে,

  • "ভগবানকে কেউ সৃষ্টি করেছে",

  • আবার "ভগবান সৃষ্টি হয়েছে",
    — যা নিজেই একটি বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি নয়, বরং বিতর্কযোগ্য ধারণা।


🔎 তাহলে আগের প্রশ্নটি কেন Loaded?

“সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টিকারী পরমেশ্বর ভগবানকে কে সৃষ্টি করেছেন?”
এই প্রশ্নের ভেতরে আগে থেকেই দুটি অঘোষিত অনুমান লুকিয়ে রয়েছে:

  1. ঈশ্বর সৃষ্ট (created) সত্তা — যা অনেক ধর্ম ও দর্শনের মতে সত্য নয়।

  2. ঈশ্বর সময়ের সীমায় বাঁধা — অথচ ঈশ্বর সময়-স্থান-কারণ এই সব কিছুর বাইরেই আছেন, এমন ধারণা বহু ধর্মে রয়েছে।

সুতরাং, প্রশ্নটি একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, যা সব দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে সত্য নয়। ফলে এটি ফাঁদ তৈরি করে।


🎓 Logical Fallacy হিসেবে এর সমস্যা কী?

  • এটি যুক্তিকে ধোঁকা দেয়, কারণ এটি উত্তরদাতাকে এমন কিছু স্বীকার করতে বাধ্য করে যা সে আদৌ বিশ্বাস করে না।

  • এটি বিতর্কে অন্য পক্ষকে ঠকাতে বা বিপদে ফেলতে ব্যবহৃত হতে পারে।

  • এটি সঠিক যুক্তি-বিচার ও জিজ্ঞাসা-কে বাধাগ্রস্ত করে।


✅ Loaded Question এড়িয়ে কীভাবে যুক্তি করতে হয়?

এমন প্রশ্ন করার আগে নিজেই প্রশ্নের ভিতরের অনুমানগুলো যাচাই করা দরকার।

সঠিকভাবে প্রশ্নটি হতো:

“ধর্মীয় ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, ঈশ্বর কি সৃষ্ট নাকি স্বয়ম্ভূ সত্তা?”

এটি নিরপেক্ষ ও যুক্তিপূর্ণ, এবং Loaded নয়।


🔚 উপসংহার

তোমার প্রশ্নটি চমৎকারভাবে দর্শনচর্চার দরজা খুলেছে। এটা শুধু ঈশ্বর-সংক্রান্ত নয়, বরং চিন্তার শুদ্ধতা ও যুক্তি বিশ্লেষণের দিক থেকেও অসাধারণ।