জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা মহারানীর এই অদ্ভুত ও অসম্পূর্ণ মূর্তির নেপথ্যে যেমন গভীর পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে, তেমনি রয়েছে সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। এই রূপের রহস্য মূলত দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয় —
১. পৌরাণিক কাহিনী (মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের উপাখ্যান) কিংবদন্তি অনুসারে, ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সমুদ্রের তীরে পাওয়া অলৌকিক দারু (কাঠ) থেকে বিগ্রহ তৈরির উদ্যোগ নেন। ছদ্মবেশে ভগবান বিশ্বকর্মা স্বয়ং এই বিগ্রহ তৈরির দায়িত্ব নেন, তবে একটি শর্ত দেন যে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ ঘরের দরজা খুলতে পারবে না।
২১ দিন কাজ চলার কথা থাকলেও অধৈর্য রাজা ১৫ দিন পর কোনো শব্দ শুনতে না পেয়ে দরজা খুলে দেন।
শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় বিশ্বকর্মা কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই অদৃশ্য হয়ে যান। তখন মূর্তির হাত, পা এবং পূর্ণ অবয়ব গঠিত হয়নি।
রাজা অনুতপ্ত হলেও ভগবান জগন্নাথ স্বপ্নে তাঁকে জানান যে, তিনি এই 'অসম্পূর্ণ' রূপেই পৃথিবীতে ভক্তদের পূজা গ্রহণ করতে চান।
২. আধ্যাত্মিক রহস্য (মহাভাবের প্রকাশ) গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন এবং স্কন্দপুরাণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই রূপটি হলো পরম প্রেমের এক চরম অবস্থা বা 'মহাভাব'-এর বহিঃপ্রকাশ।
বড় বড় চোখ: কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলার কথা স্মরণ করে যখন জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা বিমোহিত হন, তখন বিস্ময়ে তাঁদের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এটি তাঁর সদা-জাগ্রত দৃষ্টির প্রতীক, যা সব সময় ভক্তদের ওপর নজর রাখে।
হাত ও পা না থাকা: গভীর প্রেমে নিমগ্ন অবস্থায় তাঁদের হাত ও পা শরীরের ভেতরে সংকুচিত হয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে, ভগবানকে পাওয়ার জন্য শারীরিক পূর্ণতা নয়, বরং ভক্তিই মুখ্য।
অব্যক্ত রূপ: শ্রী জগন্নাথের হাত নেই কিন্তু তিনি সব সেবা গ্রহণ করেন, পা নেই কিন্তু তিনি সর্বত্র বিরাজমান। এটি উপনিষদের 'অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা' (হাত-পা না থাকলেও তিনি সব কিছু গ্রহণ করতে ও সর্বত্র যেতে পারেন) তত্ত্বকে সমর্থন করে।
রূপের প্রতীকী অর্থ
জগন্নাথ (কালো): তিনি মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য ও শূন্যতার প্রতীক।
বলদেব (সাদা): তিনি শুদ্ধতা এবং জ্ঞানের আধার]।
সুভদ্রা (হলুদ): তিনি শক্তি ও ঐশ্বর্যের মূর্ত রূপ।


