ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৯ শতকের বাংলা তথা ভারতের একজন মহান সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ছিলেন। সমাজে জাঁকিয়ে বসা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি একাই এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।
সমাজ সংস্কারে তাঁর প্রধান অবদানগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. বিধবা বিবাহ প্রচলন
বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক সাফল্য ছিল বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ করা।
তৎকালীন সমাজে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে হতো এবং স্বামীদের মৃত্যুর পর এই অল্পবয়সী মেয়েদের চরম অমানবিক ও কষ্টকর জীবনযাপন করতে হতো।
বিদ্যাসাগর পরাশর সংহিতা সহ বিভিন্ন হিন্দু শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে শাস্ত্রে বিধবা বিবাহের অনুমতি রয়েছে।
তাঁর তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৬ সালের২৬ জুলাই 'হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন' (Hindu Widows' Remarriage Act, 1856) পাস করে।
শুধু আইন পাস করাই নয়, তিনি নিজ খরচে বহু বিধবা বিবাহ সম্পাদন করান এবং নিজের একমাত্র ছেলে নারায়ণচন্দ্রের বিয়েও এক বিধবার সাথেই দেন।
২. বহুবিবাহ রদ আন্দোলন
তৎকালীন সমাজে, বিশেষ করে কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে পুরুষদের অগণিত বিয়ে করার এক কুপ্রথা প্রচলিত ছিল। বৃদ্ধ পুরুষরাও অর্থের লোভে বহু বালিকার সাথে বিয়ে করত। વિદ્યાસાગর এই প্রথার বিরুদ্ধে বই লেখেন, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন এবং সরকারের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন।
৩. বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ
অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতো এবং বিধবা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ত। বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলো সমাজে তুলে ধরেন এবং তা বন্ধ করার জন্য সামাজিক জনমত গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে সম্মতির বয়স (Age of Consent) সংক্রান্ত আইন গঠনে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
৪. নারী শিক্ষার প্রসার
সমাজ সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে তিনি নারী শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীদের শিক্ষিত না করলে সমাজের প্রকৃত উন্নতি অসম্ভব।
তিনি ড্রিংকওয়াটার বিটনের সাথে মিলে ১৮৪৯ সালে তৈরি করেন বিখ্যাত বেথুন স্কুল (Bethune School)।
তিনি নিজ উদ্যোগে ও খরচে বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় (বিশেষ করে নম্বর, নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুরে) ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
৫. মানবিকতা ও সাধারণ সমাজ সেবা
তিনি কোনো জাতপাত বা ধর্মীয় ভেদাভেদ মানতেন না। দুর্ভিক্ষ, মহামারী বা সাধারণ মানুষের যেকোনো বিপদে তিনি মুক্তহস্তে দান করতেন। তাঁর এই অতুলনীয় দয়ার জন্য সাধারণ মানুষ তাঁকে "দয়ার সাগর" উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
সংক্ষেপে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রাচীন প্রথা ও কুসংস্কারের শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি সমাজকে আধুনিক, যুক্তিভিত্তিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।


