সনাতন ধর্মে এবং আধ্যাত্মিক দর্শনে সকল জীবের প্রতি দয়া দেখানোকে সরাসরি ঈশ্বর সেবার সমতুল্য বা তার চেয়েও বড় মনে করা হয়। শাস্ত্রীয় ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর মূল কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সর্বভূতে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান (অদ্বৈত ও দ্বৈত তত্ত্ব)
শাস্ত্রে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, ঈশ্বর কেবল মন্দিরে বা মূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; তিনি প্রতিটি জীবদেহের ভেতরে 'আত্মা' বা 'পরমাত্মা' রূপে বিরাজ করছেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৮.৬১) শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন:
"ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঽর্জুন তিষ্ঠতি..." অর্থাৎ, হে অর্জুন! ঈশ্বর সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থান করেন।
যেহেতু প্রতিটি জীবের ভেতরেই ঈশ্বরের অংশ বা স্বয়ং ঈশ্বর বিরাজমান, তাই কোনো জীবের কষ্ট দূর করা বা তার প্রতি দয়া দেখানোর অর্থ হলো সরাসরি সেই জীবের অন্তরে থাকা ঈশ্বরেরই সেবা করা।
২. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা: "জীবে দয়া, নামে রুচি"
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে জীবসেবাকে ভক্তির অন্যতম প্রধান অঙ্গ মনে করা হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সনাতন ধর্মের সারকথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন:
"জীবে দয়া, নামে রুচি, বৈষ্ণব সেবন। ইহা বই ধর্ম নাই শুন সনাতন।।" শ্রীল সনাতন গোস্বামীকে দেওয়া এই শিক্ষায় স্পষ্ট যে, জীবের প্রতি দয়া না থাকলে ভগবানের প্রতি ভক্তি কখনোই পূর্ণতা পায় না। জীবকে কষ্ট দিয়ে ঈশ্বরের পূজা করলে ঈশ্বর সেই পূজা গ্রহণ করেন না।
৩. শিব জ্ঞানে জীব সেবা (স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন)
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং স্বামী বিবেকানন্দ এই তত্ত্বটিকে আধুনিক সমাজে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, "দয়া নয়, শিব জ্ঞানে জীব সেবা"। অর্থাৎ, জীবের ওপর করুণা বা দয়া দেখানোর অহংকার না করে, জীবকে স্বয়ং 'শিব' বা ঈশ্বর মনে করে তাঁর সেবা করা উচিত। স্বামী বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত বাণীটি এই তত্ত্বেরই শ্রেষ্ঠ প্রকাশ:
"বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।"
৪. কর্মফল ও ব্রহ্মাণ্ডের একাত্মতা
আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান অনুযায়ী, এই মহাবিশ্বের সবকিছু একে অপরের সাথে যুক্ত। আমরা যখন অন্য কোনো জীবের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখাই, তখন আমরা আসলে প্রকৃতির সেই ঈশ্বরীয় নিয়মের অবমাননা করি। পক্ষান্তরে, যখন কোনো ক্ষুধার্ত পশুকে অন্ন দেওয়া হয় বা কোনো আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়, তখন ব্রহ্মাণ্ডের ভারসাম্য রক্ষা পায়। ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টির প্রতি এই ভালোবাসায় সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট হন।


