ইসকন (ISKCON) একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে সারা বিশ্বে আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং মানবিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ১৯৬৬ সালে নিউ ইয়র্কে শ্রীমৎ এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এটি প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের অবদান অনেক বিস্তৃত।
প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিচে আলোচনা করা হলো —
১. ‘ফুড ফর লাইফ’ (Food for Life)
এটি বিশ্বের বৃহত্তম নিরামিষ খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি। ইসকন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দরিদ্র ও দুর্যোগপীড়িত মানুষের মধ্যে পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় (যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ বা ভূমিকম্প) তাদের স্বেচ্ছাসেবীরা নিরলসভাবে সেবা দিয়ে থাকেন।
২. ভগবদগীতা ও বৈদিক সংস্কৃতির প্রসার
ইসকন বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলোতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্র অনুবাদ ও বিতরণ করেছে। এর মাধ্যমে ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃতি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও তাদের সাহিত্য গবেষণার বিষয় হিসেবে স্বীকৃত।
৩. নিরামিষাশী জীবনধারা ও অহিংসা
সারা বিশ্বে নিরামিষ আহার (Vegetarianism) জনপ্রিয় করার পেছনে ইসকনের বড় অবদান আছে। তারা কয়েকশ 'গোবিন্দাস' (Govinda's) রেস্তোরাঁ পরিচালনা করে, যা স্বাস্থ্যকর এবং সাত্ত্বিক খাবারের ধারণা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করেছে। এছাড়া পশু হত্যা রোধে তারা গোরক্ষা ও কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার ওপর জোর দেয়।
৪. ভক্তিযোগ ও মানসিক শান্তি
আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে অবসাদ ও মানসিক দুশ্চিন্তা কমাতে ইসকন 'হরে কৃষ্ণ' মহামন্ত্র জপ এবং ধ্যানকে একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে তুলে ধরেছে। এটি অসংখ্য মানুষকে মাদকাসক্তি এবং নেতিবাচক জীবনধারা থেকে সরিয়ে এনে একটি সুশৃঙ্খল ও অর্থবহ জীবন দিতে সাহায্য করেছে।
৫. পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই জীবনযাপন
ইসকন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ‘ইকো-ভিলেজ’ (Eco-village) গড়ে তুলেছে। যেখানে প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদ, সৌরশক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার মডেল দেখানো হয়। যেমন ভারতের মহারাষ্ট্রের 'গোবর্ধন ইকো-ভিলেজ' জাতিসংঘ থেকে পরিবেশ রক্ষার জন্য পুরস্কার লাভ করেছে।
৬. মন্দির ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, সিডনি থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে তারা শৈল্পিক মন্দির ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মায়াপুরে নির্মিত হচ্ছে ‘চন্দ্রোদয় মন্দির’ বা ‘Temple of the Vedic Planetarium’, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে পরিগণিত হবে।
সারসংক্ষেপ: ইসকনের অবদান কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়; তারা শিক্ষা, মানবিক সেবা, পরিবেশ রক্ষা এবং বিশ্বজুড়ে অহিংসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রসারে একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।


