সনাতন ধর্মে তিলক ধারণ করা কেবল একটি প্রথা নয়, এটি আধ্যাত্মিক সচেতনতা এবং বিশেষ সম্প্রদায়ের পরিচায়ক। তিলক সাধারণত মূলত তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হলেও, সম্প্রদায়ভেদে এর অনেক উপবিভাগ রয়েছে।
প্রধান তিলকগুলো হলো —
১. উর্ধ্বপুণ্ড্র তিলক (বৈষ্ণব তিলক)
ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের উপাসকরা এই তিলক ধারণ করেন। এটি সাধারণত চন্দন বা পবিত্র মাটির (যেমন গোপীচন্দন) সাহায্যে কপালে ইংরেজি 'U' অক্ষরের মতো লম্বালম্বিভাবে আঁকা হয়।
তাৎপর্য: এটি ভগবানের চরণপদ্মের প্রতীক।
প্রকারভেদ: বৈষ্ণবদের বিভিন্ন শাখা যেমন—গৌড়ীয় বৈষ্ণব, শ্রী সম্প্রদায় (রামধনু তিলক), বল্লভ সম্প্রদায় ইত্যাদির তিলকের গঠনে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে। কিছু তিলকের মাঝে তুলসী পাতার আকৃতি বা একটি বিন্দু (শ্রী) থাকে।
২. ত্রিপুণ্ড্র তিলক (শৈব তিলক)
ভগবান শিবের উপাসকরা এই তিলক ধারণ করেন। এটি কপালে তিনটি সমান্তরাল আড়াআড়ি রেখার মতো হয়, যা সাধারণত বিভূতি বা ভস্ম (পবিত্র ছাই) দিয়ে আঁকা হয়।
তাৎপর্য: এই তিনটি রেখা মানুষের অহংকার, মোহ এবং মায়া ত্যাগের প্রতীক। মাঝখানে প্রায়ই একটি লাল বিন্দু থাকে যা শিবের তৃতীয় নয়ন বা শক্তির প্রতীক।
৩. তিলক বা টিপ (শাক্ত তিলক)
দেবী দুর্গা, কালী বা শক্তির উপাসকরা এটি ব্যবহার করেন। এটি সাধারণত সিঁদুর, কুমকুম বা লাল চন্দন দিয়ে তৈরি একটি গোল বিন্দু বা ঊর্ধ্বমুখী রেখা হয়।
তাৎপর্য: লাল রঙ শক্তি, সাহস এবং বিজয়ের প্রতীক। এটি আজ্ঞা চক্রকে জাগ্রত করার সংকেত দেয়।
উপাদানের ভিত্তিতে তিলকের প্রকারভেদ
তিলক কী দিয়ে তৈরি হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে এর ভিন্ন ভিন্ন নাম ও গুণ রয়েছে:
চন্দন তিলক: মন শান্ত রাখতে এবং একাগ্রতা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।
বিভূতি/ভস্ম: বৈরাগ্য এবং জীবনের নশ্বরতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
কুমকুম/সিঁদুর: সৌভাগ্য এবং তেজ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।
মৃত্তিকা তিলক: পবিত্র গঙ্গা বা বৃন্দাবনের মাটি দিয়ে তৈরি, যা আধ্যাত্মিক শুদ্ধি আনে।
তিলক ধারণের স্থান
যদিও কপালে তিলক সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তবে শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী শরীরের ১২টি স্থানে (যেমন কপাল, পেট, বুক, ঘাড়, দুই বাহু ইত্যাদি) তিলক ধারণের বিধান রয়েছে। প্রতিটি স্থানকে ভগবানের একেকটি নামের সাথে উৎসর্গ করা হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিলক হলো শরীরের মন্দিরে ভগবানের উপস্থিতির একটি চিহ্ন।


