আকাশ-প্রদীপ হলো গ্রামবাংলার একটি অতি প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী লোক-আচার। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এর বিশেষ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে। মূলত কার্তিক মাস জুড়ে সন্ধ্যার সময় বাঁশের মাথায় প্রদীপ জ্বালিয়ে উঁচুতে আকাশ অভিমুখে তুলে ধরাকে ‘আকাশ-প্রদীপ’ বলা হয়।
আকাশ-প্রদীপ সম্পর্কে কিছু মূল তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. কেন জ্বালানো হয়? (উদ্দেশ্য)
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, কার্তিক মাসে প্রয়াত পূর্বপুরুষরা বা পিতৃপুরুষরা মর্ত্যের কাছাকাছি আসেন। তাঁদের অন্ধকার পথ আলোকিত করতে এবং তাঁদের আত্মার শান্তির কামনায় এই প্রদীপ জ্বালানো হয়। অনেকে একে পরমেশ্বরের উদ্দেশে নিবেদিত আলো হিসেবেও গণ্য করেন।
২. স্থাপন পদ্ধতি
এটি সাধারণ প্রদীপের মতো মাটিতে বা ঘরে রাখা হয় না। একটি লম্বা বাঁশের আগায় দড়ি এবং চড়কির সাহায্যে একটি বিশেষ ছিদ্রযুক্ত মাটির হাঁড়ি বা কাঁচের ফানুস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তার ভেতরে সরষের তেলের প্রদীপ জ্বালানো থাকে। বাঁশটি এমনভাবে উঁচু করা হয় যাতে অনেক দূর থেকে সেই আলো দেখা যায়।
৩. সময়কাল
সাধারণত আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি থেকে শুরু করে পুরো কার্তিক মাস জুড়ে প্রতি সন্ধ্যায় এই প্রদীপ জ্বালানো হয়। কার্তিকী পূর্ণিমায় এর বিশেষ সমাপন ঘটে।
৪. লোকজ তাৎপর্য
ধর্মীয় কারণ ছাড়াও প্রাচীনকালে এর একটি ব্যবহারিক দিক ছিল। কার্তিক মাস হলো ফসলের মাস। উঁচুতে প্রদীপ জ্বালানোর ফলে খেতের ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় আলোর টানে সেদিকে আকৃষ্ট হতো, যা এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘পেস্ট কন্ট্রোল’ হিসেবে কাজ করত।
বর্তমানে আধুনিক নগরায়ন এবং বিজলি বাতির আধিক্যে এই ঐতিহ্যটি গ্রামবাংলা থেকেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে এবং মন্দির প্রাঙ্গণে আজও এই সুন্দর প্রথাটি টিকে আছে।


