শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতা এবং অন্যান্য শাস্ত্রে (যেমন শ্রীমদ্ভাগবত) জ্ঞান, কর্ম এবং অষ্টাঙ্গ যোগের মতো গভীর ও শক্তিশালী পথগুলোর কথা বিস্তারিত আলোচনা করার পরেও, শেষ পর্যন্ত ভক্তি ও প্রেমকেই সর্বোচ্চ এবং সর্বোত্তম পথ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের শুরুতেই অর্জুন যখন প্রশ্ন করেন — যাঁরা নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করেন এবং যাঁরা সাকার ভগবানের ভক্তি করেন, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোগী কে? শ্রীকৃষ্ণ সরাসরি উত্তর দেন —
ময্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।
শ্রদ্ধয়া পরযোপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ॥
— গীতা ১২/২অর্থ: যাঁরা আমাতে মন অর্পণ করে একাগ্রচিত্তে পরম শ্রদ্ধার সাথে আমার উপাসনা করেন, তাঁদেরই আমি সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী মনে করি।
শ্রীকৃষ্ণ কেন প্রেম ও ভক্তিকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন, তার মূল কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো —
১. ভক্তি হলো সবচেয়ে সহজ ও সার্বজনীন পথ
জ্ঞানযোগের জন্য প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন হয়; কর্মযোগের জন্য ফলের আশা ত্যাগ করে নিখুঁতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়; আর অষ্টাঙ্গ যোগের জন্য কঠোর শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলার (যেমন নির্জন বনে গিয়ে ধ্যান) প্রয়োজন হয়। এগুলো সবার পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু ভক্তি ও প্রেমের জন্য কোনো জাগতিক যোগ্যতা বা পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন নেই। ধনী-দরিদ্র, পণ্ডিত-মূর্খ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যে কেউ কেবল অন্তরের ব্যাকুলতা দিয়ে ভগবানকে ভালোবাসতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন —
পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।
তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ॥
— গীতা ৯/২৬অর্থাৎ, কেউ যদি আমাকে ভক্তিভরে একটি পাতা, একটি ফুল, একটি ফল বা সামান্য জলও অর্পণ করে, আমি তাঁর সেই ভালোবাসার উপহার সানন্দে গ্রহণ করি।
২. ভক্তিতে সরাসরি ভগবানের "আশ্রয়" পাওয়া যায়
অন্যান্য যোগে সাধককে নিজের চেষ্টায়, নিজের শক্তিতে মায়ার বন্ধন কাটতে হয়। কিন্তু ভক্তিযোগের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে সাধক ভগবানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেন। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই তাঁর ভক্তের সমস্ত দায়িত্ব নেন। গীতার বিখ্যাত চরম শ্লোকে তিনি অর্জুনকে অভয় দিয়ে বলেছেন —
সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥
— গীতা ১৮/৬৬অর্থাৎ, সমস্ত ধর্ম বা পথ ত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব, তুমি শোক করো না।
৩. ভগবান কেবল প্রেমের কাছেই পরাস্ত হন
বৈষ্ণব ও সনাতন দর্শনে ভগবানকে বলা হয়েছে 'অজেয়' — যাঁকে কোনো শক্তি দিয়ে জয় করা যায় না। কিন্তু প্রেমের এমন এক অপ্রাকৃত শক্তি আছে, যা পরমেশ্বরকেও বেঁধে ফেলে।
জ্ঞান বা যোগ দিয়ে ভগবানের মহিমা ও ঐশ্বর্য অনুধাবন করা যায়, কিন্তু তাঁকে আপন করে পাওয়া যায় না। একমাত্র নিঃস্বার্থ প্রেমের মাধ্যমেই ভগবান ভক্তের সখা (যেমন অর্জুন), সন্তান (যেমন যশোদার কৃষ্ণ) বা প্রাণনাথ হয়ে ওঠেন। কৃষ্ণ ঐশ্বর্যের চেয়ে ভক্তের ভালোবাসার মাধুর্য আস্বাদন করতে বেশি ভালোবাসেন।
৪. ভক্তি পরম শান্তিময় ও পতনহীন পথ
জ্ঞান বা যোগের পথে কঠোর অহংকার বা সূক্ষ্ম বিচ্যুতির কারণে সাধকের পতনের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু ভক্তিযোগের পথটি অত্যন্ত নিরাপদ। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জোর দিয়ে বলেছিলেন —
ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি — আমার ভক্তের কখনো বিনাশ বা পতন হয় না।
ভক্তিতে সাধনা করার সময়ও এক ধরণের পরম আনন্দ ও মানসিক শান্তি অনুভূত হয়, যা অন্য কঠিন ও শুষ্ক সাধনায় শুরুতে পাওয়া যায় না।
শ্রীকৃষ্ণের মতে, জ্ঞান বা কর্ম হলো ভগবানের কাছে পৌঁছানোর সিঁড়ি বা মাধ্যম মাত্র, কিন্তু প্রেম ও ভক্তি হলো স্বয়ং লক্ষ্য। ভগবান কোনো নিয়ম বা আচারের ক্ষুধার্ত নন, তিনি কেবল হৃদয়ের ভাব ও প্রেমের ক্ষুধার্ত। তাই তিনি প্রেম ও ভক্তিকে জীবনের পরম শ্রেয় এবং সর্বোচ্চ পথ বলেছেন।


