শিবপূজায় বিল্লপত্র বা বেলপাতা অর্পণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যিক একটি প্রথা। শিবপুরাণ এবং অন্যান্য শাস্ত্রে দেবদেবীদের মধ্যে মহাদেবকে বেলপাতায় সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট হতে দেখা যায়।
শিবকে বেলপাতা দেওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি পৌরাণিক, আধ্যাত্মিক এবং বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে —
১. পৌরাণিক কারণ: সমুদ্রমন্থন ও বিষের জ্বালা প্রশমন পৌরাণিক কথা অনুযায়ী, দেবতা ও অসুরদের দ্বারা সমুদ্রমন্থনের সময় চরম বিষাক্ত 'কালকূট' বা 'হালাহল' বিষ উঠে আসে। সম্পূর্ণ সৃষ্টিকে রক্ষা করতে মহাদেব সেই বিষ নিজে পান করেন এবং তা গলায় আটকে রাখেন (যার ফলে তাঁর নাম হয় নীলকণ্ঠ)।
বিষের তীব্র তাপে শিবের শরীর প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন দেবতারা তাঁর শরীরের তাপ ও বিষের জ্বালা কমানোর জন্য মাথায় জল ঢালতে শুরু করেন এবং বেলপাতা অর্পণ করেন। আয়ুর্বেদ মতে বেলপাতার প্রকৃতি অত্যন্ত শীতল। বেলপাতার এই শীতলীকরণ গুণ মহাদেবের বিষের জ্বালা প্রশমিত করেছিল। এতে সন্তুষ্ট হয়ে শিব ঘোষণা করেন যে, বিশুদ্ধ মনে তাঁকে বেলপাতা অর্পণ করলে তিনি পরম প্রীত হবেন।
২. বেলপাতার গঠন ও আধ্যাত্মিক অর্থ (তিনটি পাতার তাৎপর্য)
শিবপূজায় সাধারণত তিনটি একবৃন্তে থাকা বেলপাতা অর্পণ করা হয়। এই ত্রিপত্র রূপটির গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে —
ত্রিনেত্র ও ত্রিশূল: বেলপাতার তিনটি পাতা মহাদেবের তিনটি চোখ (সূর্য, চন্দ্র ও অগ্নি) এবং তাঁর অস্ত্র ত্রিশূলের প্রতীক।
ত্রিদেব (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর): তিনটি পাতাকে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কারক ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সম্মিলিত রূপ মনে করা হয়।
ত্রিগুণ (সত্ত্ব, রজ, তম): এটি মানুষের ভেতরের তিন গুণ—সত্ত্ব, রজ ও তমের সামঞ্জস্যকে নির্দেশ করে। শিবকে বেলপাতা দেওয়ার অর্থ হলো নিজের ভেতর থাকা এই তিন গুণ বা প্রবৃত্তি ঈশ্বরচরণে সমর্পণ করা।
৩. পাপ মোচন ও ভক্তির প্রতীক
শিবপুরাণে বলা হয়েছে — বিল্লপত্রের মূলে সমস্ত তীর্থস্থান অবস্থান করে। তাই একটি মাত্র শুদ্ধ বেলপাতা ভক্তিভরে অর্পণ করলে কোটি যজ্ঞের ফল পাওয়া যায় এবং ভক্তের জন্মান্তরের পাপ ও তিন ধরনের তাপ (আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক, আধিদৈবিক) দূর হয়।
ত্রিদলং ত্রিগুণাকারং ত্রিনেত্রঞ্চ ত্র্যাযুদ্ধম্।
ত্রিজন্মপাপসংহারং একবিল্বং শিবার্পণম্॥
অর্থাৎ, তিন পাতা বিশিষ্ট, তিন গুণের প্রতীক, ত্রিনেত্র ও ত্রিশূলের মতো এবং তিন জন্মের পাপ বিনাশকারী এই বেলপাতা আমি শিবের চরণে অর্পণ করছি।
৪. প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণ
মহাদেব হলেন 'আশুতোষ' (যিনি খুব সহজেই সন্তুষ্ট হন)। অন্যান্য দেবদেবীর মতো তাঁর পূজায় অমূল্য রত্ন, দামী বস্ত্র বা জটিল কোনো উপাচারের প্রয়োজন হয় না। প্রকৃতিতে অনায়াসে পাওয়া যায় এমন ফল ও পাতাতেই (যেমন জল, আকন্দ ফুল, ধুতরা ও বেলপাতা) তিনি সন্তুষ্ট হন। এটি প্রকৃতির সাথে মানুষের সংযুক্তি এবং সরলতার প্রতীক।
তাই সংক্ষেপে বলা যায়, সমুদ্রমন্থনের সময় বিষের প্রচণ্ড তাপ থেকে মুক্তি দিতে এবং মহাদেবের শরীর শীতল করতে প্রথম বেলপাতা ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া এর তিনটি পাতা ত্রিশূল, ত্রিনেত্র ও ত্রিদেবের প্রতীক হওয়ায় শিবপূজায় বেলপাতা অর্পণ পরম পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হয়।


