ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে 'গোপাল' বলা হয় তাঁর বাল্যকালের কর্মকাণ্ড এবং গোরু বা গো-সম্পদের প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসার কারণে।
'গোপাল' শব্দটি মূলত দুটি সংস্কৃত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত:
'গো' (Go): যার অর্থ গোরু, পৃথিবী বা ইন্দ্রিয়।
'পাল' (Pala): যার অর্থ পালনকারী, রক্ষক বা চারণকারী।
সুতরাং, 'গোপাল' শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো 'যিনি গোরু পালন বা রক্ষা করেন'।
শ্রীকৃষ্ণকে 'গোপাল' ডাকার পেছনে প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. গোরু পালন ও রাখাল রূপ
বাল্যকালে বৃন্দাবনে গোপরাজ নন্দ মহারাজের ঘরে শ্রীকৃষ্ণ বেড়ে ওঠেন। নন্দ মহারাজের লাখ লাখ গোরু ছিল। শিশু বয়সেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রাখাল বালকদের (সখাদের) সাথে নিয়ে প্রতিদিন বৃন্দাবন ও গোকুলের বনে গোরু চড়াতে যেতেন। তিনি পরম স্নেহে গোরুদের দেখাশোনা ও লালন-পালন করতেন, তাই সবাই তাঁকে ভালোবেসে 'গোপাল' বলে ডাকত।
২. গোরুদের প্রতি গভীর ভালোবাসা
শ্রীকৃষ্ণ প্রতিটি গোরুকে এতটাই ভালোবাসতেন যে তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম রেখেছিলেন (যেমন: ধবলী, শ্যামলী, গঙ্গা ইত্যাদি)। বাঁশি বাজিয়ে তিনি গোরুদের নাম ধরে ডাকতেন এবং বাঁশির সুর শুনে গোরুরা তাঁর চারপাশে ছুটে আসত।
৩. গোরু ও গোর্খা সম্প্রদায় রক্ষা
ব্রজবাসীদের প্রধান জীবিকা ও সম্পদ ছিল গোরু বা গো-সম্পদ। মহাদেব বা ইন্দ্রের কৃপাদৃষ্টির চেয়েও গোরুদের সেবা করাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এমনকি দেবরাজ ইন্দ্রের কোপ থেকে বৃন্দাবনের সমস্ত মানুষ ও গোরুদের রক্ষা করতে শ্রীকৃষ্ণ নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পর্বত ধারণ করেছিলেন। গোরুদের রক্ষা করেছিলেন বলেই ইন্দ্র তাঁর নাম দিয়েছিলেন 'গোবিন্দ' ও 'গোপাল'।
৪. গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ
সনাতন ধর্মে 'গো' শব্দের আরও কয়েকটি আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে:
পৃথিবীর রক্ষক: বৈদিক সাহিত্যে পৃথিবীকে 'গো' (গাভী) রূপ ধরে ভগবানের শরণাপন্ন হতে দেখা যায়। শ্রীকৃষ্ণ এই ধরণী বা পৃথিবীকে পাপের হাত থেকে রক্ষা ও পালন করেন বলে তিনি 'গোপাল'।
ইন্দ্রিয়ের রক্ষক: 'গো' শব্দের অর্থ মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহ। যিনি মানুষের অনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয়গুলোকে সঠিক পথে চালিত ও পালন করেন, তিনিই গোপাল।
সংক্ষেপে:
বাৎসল্য রসে ভক্তরা যখন শ্রীকৃষ্ণের বাল্যরূপ বা শিশু রূপের সেবা করেন, তখন পরম আদরে তাঁকেই 'বাল গোপাল' বা 'লাড্ডু গোপাল' বলা হয়।


