শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং বেদ - এর সম্পর্ক মূলত বৃক্ষ ও তার মিষ্টি ফলের মতো। গীতাকে বলা হয় বেদের নির্যাস বা বেদের সর্বোচ্চ উপলব্ধির প্রকাশ।
বেদ ও গীতার পারস্পরিক সম্পর্ক ও মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো —
১. বেদান্ত বা উপনিষদের নির্যাস
বেদকে প্রধানত দুটি কাণ্ডে ভাগ করা হয় —
কর্মকাণ্ড: যজ্ঞ, আচার-অনুষ্ঠান ও বৈষয়িক সমৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন মন্ত্র।
জ্ঞানকাণ্ড: উপনিষদ, যেখানে পরম সত্য, আত্মা ও ঈশ্বর সম্পর্কিত দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনা করা হয়েছে।
গীতা হলো বেদের এই দ্বিতীয় অংশ অর্থাৎ জ্ঞানকাণ্ডের সংক্ষেপ ও নির্যাস। এ বিষয়ে একটি সংস্কৃত শ্লোক ও রয়েছে —
সর্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ।
পার্থো বৎসঃ সুধীর্বোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ॥
অনুবাদ: সমস্ত উপনিষদ হলো গাভী স্বরূপ, শ্রীকৃষ্ণ হলেন সেই গাভীর দোহনকারী বা গোয়ালিয়া, অর্জুন হলেন বাছুর, এবং এই দুধই হলো অমৃতময় গীতা, যা সুধীজন পান করেন।
২. আত্মজ্ঞান ও ভক্তি উপর গুরুত্বারোপ
বেদের প্রথম অংশ, কর্মকাণ্ডে দেব-দেবীদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করা এবং জাগতিক ফল লাভের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বেদের সেই আচার-অনুষ্ঠানমুখী চিন্তাকে অতিক্রম করে আত্মজ্ঞান ও পরমেশ্বরের প্রতি ভক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪২-৪৫ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন —
বেদের কেবল আচার-অনুষ্ঠান ও ফলকামনায় আবদ্ধ না থেকে কর্মফল ত্যাগ করে 'ত্রিগুণাতীত' বা পরম সত্যকে লাভ করতে।
৩. প্রস্থানত্রয়ীর অন্যতম স্তম্ভ
সনাতন হিন্দু দর্শনের তিনটি প্রধান প্রামাণিক স্তম্ভকে একত্রে 'প্রস্থানত্রয়ী' বলা হয়। সেগুলো হলো —
ক. শ্রুতি প্রস্থান: উপনিষদ (বেদের মূল অংশ)
খ. ন্যায় প্রস্থান: ব্রহ্মসূত্র
গ. স্মৃতি প্রস্থান: শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা
অর্থাৎ, বেদ যদি হয় মূল ভিত্তি, তবে গীতা হলো সেই বৈদিক দর্শনকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা।
৪. বেদের কঠিন তত্ত্বকে গীতায় সহজ করে উপস্থাপন
বেদ ও উপনিষদের ভাষা অত্যন্ত গূঢ়, সাংকেতিক এবং কেবল ঋষি বা পণ্ডিতদের পক্ষে বোঝা সহজ ছিল। গীতা সেই একই বৈদিক তত্ত্বগুলো, যেমন — আত্মা, কর্ম, যোগ, মোক্ষ এগুলোকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথনের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজ ও বাস্তবমুখী করে তুলে ধরেছে।
বেদ যেখানে যজ্ঞের মাধ্যমে ঈশ্বরাধ্যানার কথা বলে, গীতা সেখানে নিষ্কাম 'কর্মযোগ' এবং 'ভক্তিযোগ' - কে শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরেছে।
বেদ হলো সনাতন ধর্মের বিশাল মহাসমুদ্র বা মূল জ্ঞানের আধার, আর শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হলো সেই মহাসমুদ্র মন্থন করে পাওয়া সংগৃহীত অমৃত।
বেদের মূল শিক্ষা হলো —
'আত্মজ্ঞানই পরম মোক্ষ', যা গীতাতেই সবচেয়ে প্রঞ্জল ও জীবনমুখীভাবে প্রকাশিত হয়েছে।


