শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় 'কর্মফল' সম্পর্কে অত্যন্ত গভীর এবং জীবনমুখী শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এর মূল দর্শন হলো মানুষ কর্মের অধিকারী, কিন্তু ফলাফলের নয়।
গীতায় কর্মফল সংক্রান্ত প্রধান শিক্ষাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. নিষ্কাম কর্মযোগ (ফলের আশা ত্যাগ করা)
গীতার সবচেয়ে বিখ্যাত শ্লোকগুলোর একটি হলো:
“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।” (অধ্যায় ২, শ্লোক ৪৭) অর্থ: তোমার কেবল কর্ম করার অধিকার আছে, কিন্তু কর্মের ফলে তোমার কোনো অধিকার নেই। অর্থাৎ, ফল কী হবে সেই চিন্তায় মগ্ন না হয়ে নিজের কর্তব্য পালন করে যাওয়াই হলো প্রকৃত ধর্ম।
২. কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শিখিয়েছেন যে, মানুষ যখন কোনো নির্দিষ্ট ফলের আশায় কাজ করে, তখন সেই ফলের প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি তাকে সুখ বা দুঃখের জালে আটকে ফেলে। যদি আমরা ফলের মায়া ত্যাগ করে কাজ করি, তবে মনের শান্তি বজায় থাকে এবং সাফল্য বা ব্যর্থতা আমাদের বিচলিত করতে পারে না।
৩. নিজেকে 'কর্তা' মনে না করা
গীতায় বলা হয়েছে যে, প্রকৃতির গুণাবলীর দ্বারাই সব কাজ সম্পন্ন হয়। কিন্তু অহংকারের বশবর্তী হয়ে মানুষ মনে করে "আমিই এই কাজটি করছি"। যখন কেউ নিজেকে ফলের একমাত্র কারণ মনে করা বন্ধ করে এবং কর্মকে ঈশ্বরের সেবা বা কর্তব্যের অংশ হিসেবে দেখে, তখন সে কর্মফলের বন্ধন থেকে মুক্তি পায়।
৪. কর্মত্যাগ নয়, কর্মফল ত্যাগ
গীতা কর্ম ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাসী হওয়ার কথা বলে না। বরং এটি শেখায় যে, সংসারে থেকেও কীভাবে অনাসক্ত হয়ে কাজ করা যায়। হাত দিয়ে কাজ করা এবং মন দিয়ে ঈশ্বরে বা ত্যাগের ভাবনায় যুক্ত থাকাই হলো প্রকৃত যোগ।
৫. কর্মের ধরন ও ফলাফল
গীতায় কর্মকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যা মানুষের চিন্তা ও আচরণের ওপর নির্ভর করে:
সাত্ত্বিক কর্ম: আসক্তিহীন এবং ফলের আশা ছাড়া করা কাজ।
রাজসিক কর্ম: অহংকার এবং অনেক কষ্টের বিনিময়ে নিজের ভোগের জন্য করা কাজ।
তামসিক কর্ম: মোহবশত, ফলাফল বা নিজের ক্ষমতার বিচার না করে করা ক্ষতিকর কাজ।
সারকথা: গীতার শিক্ষা অনুযায়ী, কর্মফল আমাদের হাতে নেই, তাই ফলের দুশ্চিন্তা করে বর্তমানের কাজকে নষ্ট করা উচিত নয়। সঠিক নিয়ত ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাওয়াই একজন মানুষের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত। একেই গীতায় 'স্থিতপ্রজ্ঞ' হওয়ার পথ বলা হয়েছে।


