দেহতত্ত্ব বলতে কি বোঝায়?
1 answers
130 views
Uzzwal Dhali
ঋষভ
Debasish Biswas
+4
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

দেহতত্ত্ব হলো ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাধনার একটি অত্যন্ত নিগূঢ় এবং প্রাচীন ধারা, যেখানে মানুষের এই নশ্বর শরীরকেই মহাবিশ্বের প্রতিরূপ বা 'ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মূল কথা হলো —

"যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহভাণ্ডে।"

অর্থাৎ, পরম সত্য বা ঈশ্বরকে বাইরে না খুঁজে নিজের শরীরের ভেতরেই খোঁজার পদ্ধতি হলো দেহতত্ত্ব।

নিচে দেহতত্ত্বের মূল বিষয়গুলো সহজভাবে আলোচনা করা হলো —

১. দেহতত্ত্বের মূল দর্শন

দেহতত্ত্বের সাধকদের মতে, এই মানবদেহ কেবল হাড়-মাংসের স্তূপ নয়, এটি একটি জীবন্ত মন্দির। বাইরের জগতে আমরা যা কিছু দেখি (নদী, পর্বত, চন্দ্র, সূর্য, ঈশ্বর), তার সবকিছুই সূক্ষ্ম রূপে আমাদের দেহের ভেতরে বিদ্যমান। বাইরের তীর্থে যাওয়ার চেয়ে নিজের ভেতরের 'তীর্থ' ভ্রমণ করাই দেহতত্ত্বের লক্ষ্য।

২. প্রধান স্তম্ভসমূহ

দেহতত্ত্ব মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে —

কায়া সাধনা: শরীরকে রোগমুক্ত, পবিত্র এবং শক্তিশালী রাখা, যাতে দীর্ঘকাল সাধনা করা যায়। (এজন্য যোগব্যায়াম ও প্রাণায়াম গুরুত্বপূর্ণ)।

ষটচক্র ভেদ: মেরুদণ্ডের নিচে থাকা 'কুলকুণ্ডলিনী' শক্তিকে জাগ্রত করে সাতটি চক্রের (মূলাধার থেকে সহস্রার) মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছানো।

দম সাধনা বা শ্বাসক্রিয়া: শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা।

৩. বিভিন্ন সাধক সম্প্রদায়ের অবদান

বাংলার লোকজ সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিকতায় দেহতত্ত্বের প্রভাব অপরিসীম:

বাউল ও সুফি দর্শন: লালন শাহসহ অসংখ্য বাউল সাধক দেহতত্ত্বের মাধ্যমে 'অচিন পাখি' বা মনের মানুষের সন্ধান করেছেন। তাঁদের গানে বারবার এসেছে —

"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।"

এখানে 'খাঁচা' হলো দেহ আর 'পাখি' হলো আত্মা।

তন্ত্র ও নাথ ধর্ম: নাথ যোগী এবং তান্ত্রিক সাধকরা বিশ্বাস করেন যে, এই দেহকে সিদ্ধ করতে পারলেই অমরত্ব বা মোক্ষ লাভ সম্ভব।

সহজিয়া বৈষ্ণব: তাঁরা দেহের কামকে প্রেমে রূপান্তরিত করে আধ্যাত্মিক সিদ্ধি লাভের কথা বলেন।

৪. দেহতত্ত্বের রূপক ভাষা

দেহতত্ত্বের সাধকরা সরাসরি কথা না বলে প্রায়ই ধাঁধা বা রূপকের আশ্রয় নেন, যাকে 'সন্ধ্যা ভাষা' বলা হয়। যেমন —

নয় দরজা: দেহের নয়টি ছিদ্র (চোখ, কান, নাক ইত্যাদি)।

ত্রিবেনী: ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নামক তিনটি প্রধান নাড়ীর মিলনস্থল।


দেহতত্ত্ব কেনো গুরুত্বপূর্ণ?

১. আত্মজ্ঞান: এটি মানুষকে নিজের ভেতরের অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে।

২. সহজ পথ: মূর্তিপূজা বা কঠিন শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে নিজের শরীর ও শ্বাসকে গুরুত্ব দিয়ে সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার সহজ পথ দেখায়।

৩. অসাম্প্রদায়িকতা: দেহতত্ত্ব কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। হিন্দু সহজিয়া, বৌদ্ধ তান্ত্রিক এবং মুসলিম সুফি—সবাই এই দেহের মাঝেই সত্যের সন্ধান করেছেন।

দেহতত্ত্ব হলো সেই জ্ঞান, যা আমাদের শেখায় যে— পরমাত্মাকে পেতে হলে বনের জঙ্গলে বা পাহাড়ের গুহায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই; যদি নিজের শরীরকে চেনা যায় এবং একে পবিত্র রাখা যায়, তবে এখানেই সেই পরম সত্তার দেখা পাওয়া সম্ভব।

Uzzwal Dhali
+1