শ্রীকৃষ্ণের জন্ম কোনো সাধারণ মানুষের মতো রক্ত-মাংসের গর্ভধারণ বা জন্ম নয়। বৈষ্ণব এবং ইসকন ভাবধারা অনুযায়ী, এটি পরমেশ্বর ভগবানের সম্পূর্ণ অলৌকিক ও স্বেচ্ছায় মর্ত্যে 'আবির্ভাব'।
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের এক অন্ধকার নিশীথ রাতে মথুরার কংসের কারাগারে পরম প্রভু শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হন। বসুদেব বা দেবকীর প্রাকৃত মিলনে তাঁর জন্ম হয়নি; ভগবান প্রথমে বসুদেবের শুদ্ধ হৃদয়ে জ্যোতি রূপে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে দেবী দেবকীর হৃদয়ে স্থানান্তরিত হন। দেবকীর ভেতরে ভগবানের এই উপস্থিতি তাঁকে এক অপার্থিব সৌন্দর্যে উজ্জ্বল করে তুলেছিল, যা দেখে কংসও বুঝতে পেরেছিল যে তার কাল ঘনিয়ে এসেছে।
যে রাতে ভগবান আসলেন, সেদিন চারদিকের প্রকৃতি যেন আনন্দে মেতে উঠেছিল। বাতাস শান্ত হয়ে গিয়েছিল, নদীতে তরঙ্গ থেমে যায়, আর আকাশে রোহিনী নক্ষত্র এক স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল। ঠিক মধ্যরাতে, কারাগারের ঘোর অন্ধকারের বুক চিরে ভগবান আবির্ভূত হলেন। তবে তিনি এক সাধারণ নবজাতক শিশু হয়ে আসেননি। তিনি দেবকী ও বসুদেবের সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন তাঁর পরম ঈশ্বর রূপ—চারটি হাত, তাতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম; মাথায় রত্নখচিত মুকুট এবং বুকে শ্রীবৎস চিহ্ন।
ভগবানের এই চতুর্ভুজ ঐশ্বর্যময় রূপ দেখে বসুদেব ও দেবকী পরম ভক্তিতে হাত জোর করে প্রণাম করেন। কিন্তু সন্তান স্নেহে মা দেবকী যখন কংসের ভয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন, তখন ভক্তের সেই বাৎসল্য ভালোবাসা মেটাতে পরমেশ্বর এক মুহূর্তে তাঁর সমস্ত ঐশ্বর্য লুকিয়ে ফেলেন। তিনি চার হাত গুটিয়ে নিয়ে এক সাধারণ, পরম সুন্দর ছোট্ট শিশুর রূপ ধারণ করলেন।
এরপর ভগবানের ইচ্ছাতেই কারাগারের রক্ষীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, হাতের ভারী শিকলগুলো খসে যায় এবং ঘরের শক্ত দরজাও একা একাই খুলে যায়। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি আর উত্তাল যমুনা। বসুদেব পরম যত্নে নবজাতক শ্রীকৃষ্ণকে একটি ঝুড়িতে নিয়ে মাথায় তুলে মথুরা থেকে গোকুলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে অনন্ত শেষনাগ নিজের সহস্র ফণা মেলে বৃষ্টি থেকে ছোট্ট কৃষ্ণকে রক্ষা করেছিলেন, আর উত্তাল যমুনা নদী স্বয়ং প্রভুর চরণ স্পর্শ করে বসুদেবকে পার হওয়ার পথ করে দিয়েছিল।
অবশেষে বসুদেব গোকুলে গিয়ে মা যশোদা ও নন্দ মহারাজের ঘরে ঘুমন্ত শিশুকন্যাটির পাশে শ্রীকৃষ্ণকে শুইয়ে দিয়ে আসেন, আর সেই কন্যাটিকে নিয়ে মথুরার কারাগারে ফিরে আসেন। এভাবেই পরম প্রভু শ্রীকৃষ্ণ ভক্তের প্রেম আস্বাদন করতে এবং ধরণীকে পাপমুক্ত করতে গোকুলে পরম আনন্দে বিরাজ করতে শুরু করেন।


