পূজার পরে মূর্তিকে কেনো নদীতে ডুবিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়?
1 answers
58 views
ঋষভ
Eva Dhali
Uzzwal Dhali
+3
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

পূজার শেষে মূর্তিকে নদীতে বা জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়ার পেছনে রয়েছে গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য, আধ্যাত্মিক দর্শন ও সাংস্কৃতিক রীতি। নিচে এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করছি:


🔱 ১. ভগবানের আগমন ও প্রত্যাবর্তনের প্রতীকঃ

🔸 যখন আমরা পূজার সময় মূর্তির মাধ্যমে ভগবানের আহ্বান করি —

তখন সেই মূর্তিকে "প্রাণপ্রতিষ্ঠা" করা হয়। অর্থাৎ, সেই মূর্তিতে ভগবানের চেতনা বা শক্তির আবাহন করা হয়।

🔸 পূজা শেষে, "উত্তরপূজা" ও "বিসর্জন" হয় —
এতে আমরা ভগবানকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন:

“হে ভগবান, আপনি আমাদের হৃদয়, গৃহ ও সমাজে আগমন করেছিলেন। এখন আপনি আপনার গৌরবময় ধামে ফিরে যান।”

🔹 এই বিসর্জন মানে — ভগবান আবার তাঁর আধ্যাত্মিক জগতে ফিরে গেলেন।


🌊 ২. পঞ্চভূতে বিলীন হওয়া (তত্ত্ব)

মূর্তি তৈরি হয় পঞ্চতত্ত্ব দিয়ে — মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ।
বিসর্জন মানে:

“যেখান থেকে আসা, সেখানে ফেরত যাওয়া।”
🔹 এটি সনাতন দর্শনের একটি মূল তত্ত্ব।

এই দেহও যেমন মৃত্যুর পরে পঞ্চভূতে বিলীন হয়,
তেমনই ভগবানের প্রতীকী মূর্তিও পূজার শেষে জলে (প্রকৃতিতে) বিলীন হয়।


🧘 ৩. আসক্তি হ্রাসের শিক্ষাঃ

🔸 পূজার সময়ে আমরা মূর্তিকে সাজাই, পূজা করি, ভালোবাসি।
কিন্তু বিসর্জনের সময় আমরা তাকে ছেড়ে দিই।

👉 এই রীতি আমাদের শেখায়—
ভগবানের প্রতি ভালোবাসা স্থায়ী হলেও, বস্তুজগতে কিছুই স্থায়ী নয়।
আমাদের চিত্ত যেন কেবল বাহ্য রূপে না, ভগবানের চেতনায় আবদ্ধ থাকে।


🌎 ৪. পরিবর্তনশীল জগতের প্রতীকঃ

🔸 মূর্তি জলে ভাসানো মানে জগতের পরিবর্তনশীলতা ও অনিত্যতার প্রতীক।
যে রূপ দেখে আমরা মুগ্ধ হই, সেটিও একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।

এটি গীতার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ —
“অশ্বত্থম্ এইমং লোকম্" — জগত একটি উল্টো অশ্বত্থ বৃক্ষ, যার শিকড় উপরে।


🪔 ৫. বিনয়ের প্রকাশঃ

বিসর্জন মানে —

“হে ভগবান, আপনি এসেছিলেন, আমাদের কৃপা করেছিলেন।
এখন আপনি যান, কিন্তু আপনার আশীর্বাদ আমাদের হৃদয়ে রয়ে যাক।”

🔹 এটি একধরনের বিনয় ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।


🏞️ ৬. প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা (প্রাচীন প্রথা)

🔸 প্রাচীনকালে মূর্তি ছিল প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি (মাটি, গরুর গোবর, পাতা) —
তাই তা পরিবেশবান্ধবভাবে জলে মিশে যেত।

বর্তমানে যদিও অনেক মূর্তি প্লাস্টার বা রঙে তৈরি হয়, তাই এখন অনেক জায়গায় পরিবেশবান্ধব বিসর্জনের জন্য কৃত্রিম জলাধার ব্যবহার করা হয়।


✅ উপসংহারঃ

বিসর্জন একটি আধ্যাত্মিক শিক্ষাঃ

  • ভগবানের আগমন ও প্রত্যাবর্তন স্মরণ

  • পঞ্চভূতের জ্ঞান ও বৈরাগ্যের বোধ

  • অসার বস্তুজগত থেকে ঈশ্বর-স্মরণে স্থিত হওয়া

🔔 এই কারণে বিসর্জন কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়,
বরং ভক্তির পরিণত রূপ, দর্শনের এক অনুশীলন।