সনাতন ধর্মে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়াকে কেবল একটি সামাজিক নিয়ম নয়, বরং জীবনের শেষ যজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হয়। 'অন্ত' মানে শেষ এবং 'ইষ্টি' মানে যজ্ঞ; অর্থাৎ 'অন্ত্যেষ্টি' হলো জীবনের চূড়ান্ত যজ্ঞ।
আমাদের সুপ্রাচীন বৈদিক সমাজ ছিল যজ্ঞপ্রধান। মানুষ ঈশ্বর প্রদত্ত দেহ ও প্রকৃতির উপাদান ভোগ করে জীবনের শেষে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নিজের দেহটিকেই 'হবি' বা হোমের দ্রব্য হিসেবে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে। এটিই অন্ত্যেষ্টির মূল ভাবধারা।
মুখাগ্নি ও অন্ত্যেষ্টির কারণসমূহ:
১. আধ্যাত্মিক কারণ ও দেবলোকে গমন:
অগ্নিদেবের মাধ্যমে অর্পণ: বৈদিক বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবলোকে বা স্বর্গে কোনো কিছু পাঠাতে হলে দেবতাদের পুরোহিত অগ্নিদেবের মাধ্যমে আহুতি দিতে হয়। অগ্নিদেবই এই আত্মাকে দিব্যলোকে নিয়ে যান।
প্রাণবায়ুর উৎসর্গ: মানুষের প্রাণবায়ু মুখ দিয়ে নির্গত হয় বলে মুখে অগ্নি সংযোগ (মুখাগ্নি) করে মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে দেহটি অগ্নিদেবকে সমর্পণ করা হয়।
মোহ ও পুনর্জন্মের মুক্তি: মানুষ দীর্ঘকাল যে দেহে বাস করে, তার প্রতি আত্মার এক ধরণের মোহ থেকে যায়। এই মোহের কারণে যেন জীবাত্মা পুনরায় সংসার-বন্ধনে বা দেহধারণে আবদ্ধ না হয়, সেজন্য দেহটি পুড়িয়ে তার জাগতিক আকর্ষণ দূর করা হয়।
২. বৈজ্ঞানিক কারণ (পরিবেশ ও স্বাস্থ্য রক্ষা):
মানুষ বিভিন্ন রোগে মৃত্যুবরণ করতে পারে। মৃতদেহে পচন ধরলে বাতাসে ও পরিবেশে মারাত্মক রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। অগ্নিদাহের মাধ্যমে সেই জীবাণু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে।
৩. সামাজিক ও দূরদর্শী কারণ (স্থান সংকুলান):
আর্য ঋষিগণ দূরদর্শী চিন্তাভাবনা থেকে এই নিয়ম করেছিলেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে যেন মৃতদেহ সৎকারের জন্য ভূমির অভাব বা স্থানাভাব না ঘটে, সেজন্য দেহ পুড়িয়ে ফেলার বিধান দেওয়া হয়েছে।
সনাতন প্রথা অনুযায়ী কারও মৃত্যু সংবাদ শুনলে প্রার্থনা স্বরূপ বলতে হয় —
পুরুষের ক্ষেত্রে: দিব্যান্ লোকান্ স গচ্ছতু (তিনি দিব্যলোকে গমন করুন)।
নারীর ক্ষেত্রে: দিব্যান্ লোকান্ সা গচ্ছতু (তিনি দিব্যলোকে গমন করুন)।


